আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ পুনর্বহাল ও আওয়ামী লীগ আমলের গুমের বিচার দাবিতে গতকাল রোববার রাজধানীতে পদযাত্রা করে সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নেন জোটের নেতা-কর্মীরা। পরে স্পিকারকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে জাতীয় কমিটির ব্যানারে গতকাল রাজধানীর বাংলামটরে সমাবেশ হয়। এতে সংহতি জানায় ১১ দল। সমাবেশ শেষে পদযাত্রা করে সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নেন জোটের নেতা-কর্মী, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।
পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিক, বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেনকে গুমের ‘মূল হোতা’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের বিচার দাবি করেন।
পদযাত্রা সড়ক অতিক্রমের সময় বিকেল চারটার দিকে অফিস ছুটির সময়ে কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। এতে আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
পদযাত্রার সামনে-পেছনে ছিল পুলিশের বেষ্টনী। সংসদ অধিবেশন চলাকালে সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ১১ দলের নেতা-কর্মীরা সংসদের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের প্রবেশপথে অবস্থান নেন। কয়েক সারিতে পুলিশ সেখানে অবস্থান নেয়। পরে ফটকের সামনে সমাবেশ করেন জোটের নেতা-কর্মীরা।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বর্জন করে সমাবেশে যোগ দেন বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ সংসদে পাস করেনি বর্তমান সরকার। আরও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত বৃহস্পতিবার সংসদে বিল উত্থাপন করেছে সরকারি দল।
গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর দেওয়ার বিধান ছিল। বিচার করার কথা ছিল ট্রাইব্যুনালে। কমিশন সন্দেহজনক গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করতে পারত।
কিন্তু নতুন বিলে বলা হয়েছে, কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী তদন্ত করতে পারবে না; অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তবাহিনী সংস্থা তদন্ত করবে। বিচার হবে জজ আদালতে। কমিশন চাইলেই সন্দেহজনক গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করতে পারবে না।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। কারাগারসহ যেকোনো স্থাপনা বিনা অনুমতিতে পরিদর্শনের সুযোগ ছিল। কমিশনের নিয়োগ বাছাই কমিটিতেও সরকারের একচেটিয়া প্রভাব রাখার সুযোগ ছিল না। নতুন আইনের বিলে এসব বিধানের কয়েকটি বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বিরোধী দলের।
বিরোধী দলের অভিযোগ, গুম প্রতিরোধ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল থেকে এসব বিধান বাদ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার গুমের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে এবং তদন্ত ও বিচারের পথ রুদ্ধ করছে।
সংসদ ভবনের সামনে সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অধ্যাদেশ বাতিল করে গুমের ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতে দিয়ে সরকার আবার গুম করার ষড়যন্ত্র করছে। গুম প্রতিরোধের অধ্যাদেশ পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা গুম করে, তাদের কাছে তদন্তের দায়িত্ব থাকতে পারে না।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুই দফা গুমের শিকার হয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসিনুর রহমান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্মারকলিপি দেওয়ার পর তিনি বলেন, তাঁদের উদ্বেগের বিষয়গুলো স্পিকারকে জানানো হয়েছে। তিনি এতে দ্বিমত করেননি এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।
নতুন বিলে গুমের মিথ্যা অভিযোগ করলে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাসিনুর রহমান বলেন, যেভাবে আইন করা হচ্ছে, তাতে কারও স্বামীকে গুম করা হয়েছিল—এমন বিষয়ও প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যাবে। ‘আমরা এ ধরনের আইন চাই না’, বলেন তিনি।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমান সরকার যেসব বিল আনছে, তা ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের চেয়েও খারাপ।
শেখ হাসিনার শাসনামলে আট বছর গুম ছিলেন ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাশেম আরমান। সমাবেশে তিনি বলেন, দেশে যেন আর কারও মানবাধিকার ক্ষুণ্ন না হয় এবং গুমের ঘটনা যেন আর ফিরে না আসে, সে জন্য এমন আইন করতে হবে, যাতে কোনো সরকার গুম করার আগে ১০ বার চিন্তা করে। গুমবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণাও দেন তিনি।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ, রোকেয়া বেগম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী, খেলাফত আন্দোলনের একাংশের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, বিডিপির জেনারেল সেক্রেটারি নিজামুল হক নাঈম, গুমের শিকার এবি পার্টির নেতা শাহাদাৎ হোসেন টুটুল এবং জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
পদযাত্রার আগে বাংলামটরের সমাবেশে বক্তব্য দেন ১১ দলের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, ব্রিগেডিয়ার মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম।
এদিকে গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে বৈঠক বর্জন করেন বিরোধী দলের দুই সংসদ সদস্য জামায়াতের নূরুল ইসলাম ও কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন। এর আগে সকালে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশ নিলেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে আলোচনায় বিরত থাকে বিরোধী দল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বৈঠকে বলেন, কোনো সদস্যের সংশোধনী বা মতামত থাকলে তা সভায় উপস্থাপন, পরামর্শ দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিরোধিতা করার সুযোগ রয়েছে। সভা থেকে ওয়াকআউট সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। মব তৈরির চেষ্টা চললেও রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেনি।
বাগেরহাটের মোংলায় নিখোঁজ মিরাজ শেখের অপহরণের দায় সরকারের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়। একে ‘দোষারোপের রাজনীতি’ আখ্যা দিয়ে তা পরিহার করা উচিত বলে সভায় মত দেওয়া হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ পরীক্ষা করে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিলটি সংসদে পাঠানো হবে। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ রকিবুল ইসলাম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু এবং শিরীন সুলতানা অংশ নেন।
বৈঠক বর্জনের বিষয়ে কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন বলেন, বিলটি দুর্বল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীবান্ধব। তাঁদের দাবি ছিল অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিল উত্থাপন করা। সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় বিল পাসের কোনো প্রক্রিয়ায় তাঁরা থাকবেন না।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সমাজের মতামত উপেক্ষা করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল পাসের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বিলটি নিয়ে আলোচনা বর্জন করে বিরোধী দল।
বিরোধী দলের মুখপাত্র ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, বিলটি পাসের প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই বিরোধী দল থাকবে না।
গতকাল স্থায়ী কমিটিতে সম্পত্তি হস্তান্তর ও মানবাধিকার বিল নিয়ে আলোচনা হয়। বিরোধী দল সম্পত্তি হস্তান্তর বিলের আলোচনায় অংশ নিলেও মানবাধিকার বিলের আলোচনা থেকে বিরত থাকে।
নাজিবুর রহমান বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে মানবাধিকার কমিশনকে আরও দুর্বল করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এমনকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্থায়ী কমিটির ‘হাত-পা বেঁধে’ মাত্র দুই দিনের মধ্যে বিলের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এতে কমিটিকে ‘রাবার স্ট্যাম্প’ করে ফেলা হয়েছে। এ কারণে বৈঠক বর্জনে তাঁরা বাধ্য হয়েছেন।
বিলটিকে ‘বিতর্কিত’ ও ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে জনগণকে রক্ষার মতো ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। এর দায়ভার তাঁরা নিতে চান না।