বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে ‘নতুন বিতর্ক এড়াতে’ ভারতের নয়াদিল্লিতে একটি সেমিনারের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফরেন করেসপন্ডেন্টস’ ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (এফসিসি) আয়োজিত ওই সেমিনারে বাংলাদেশের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
এফসিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেমিনার আয়োজনের জন্য দিল্লি পুলিশের অনুমতি পাওয়া যায়নি। তবে দিল্লি পুলিশ অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পুলিশের দাবি, এ ধরনের প্যানেল আলোচনার জন্য তাদের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই এবং কর্মসূচিতে তারা কোনো হস্তক্ষেপও করেনি।
শনিবার নয়াদিল্লির এফসিসিতে ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়ালগ টু এ পার্টনারশিপ’ শীর্ষক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। বেলজিয়ামভিত্তিক হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এ আয়োজন করা হয়।
এফসিসির প্রকাশিত আমন্ত্রণপত্র অনুযায়ী, সেমিনারের ১০ সদস্যের প্যানেলে ছিলেন চেক রাজনীতিক ওন্দ্রেজ দোস্তাল, জার্মান কূটনীতিক পিটার ফারেনহোল্টজ, বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী নুরান নবী, বাংলাদেশি আইনবিদ সেলিম মাহমুদ, নেপালের শিশু অধিকারকর্মী সুন্দর ঘিমিরে, রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রবি আলম, এফসিসি-আইএপিসির চেয়ারম্যান ভেঙ্কট নারায়ণ, সাবেক কূটনীতিক ভীণা সিক্রি, ইউনাইটেড ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আসিফ ইকবাল এবং হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের মহাসচিব গোলাম জিলানি।
সেলিম মাহমুদ বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। তাঁর সেমিনারে অংশ নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। গত ৫ আগস্ট এফসিসিতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে তিনি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
ওই সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের কাছে সমালোচনা জানানো হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এর পর এবারের সেমিনারে আওয়ামী লীগের একজন পরিচিত নেতা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে কাজ করা একজন বুদ্ধিজীবীর উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
সূত্রের ভাষ্য, এ পরিস্থিতিতে নতুন করে বিতর্ক এড়াতে দিল্লি পুলিশ সেমিনারটির অনুমতি দেয়নি।
এফসিসির এক সদস্য জানান, সেমিনারের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্লাবের একজন সদস্য তিলক মার্গ থানায় যান। সেখানে অনুষ্ঠানটির বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার পর পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, দিল্লি পুলিশ কর্মসূচিটির অনুমতি দেবে না। পরে এফসিসির সদস্যদের জানিয়ে অনুষ্ঠানটি বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ক্লাবের ব্যবস্থাপক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘দিল্লি পুলিশ ২৯ আগস্ট সন্ধ্যায় অনুষ্ঠেয় ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া কর্মসূচি আয়োজন থেকে এফসিসিকে বিরত রেখেছে। এই আকস্মিক পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’
এফসিসির প্রেসিডেন্ট ওয়ায়েল আওয়াদ বলেন, অনুষ্ঠানের বিষয় ছিল অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন। এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ছিল। কেন দিল্লি পুলিশ অনুষ্ঠানটির অনুমতি দেয়নি, তা তিনি নিশ্চিত নন।
তবে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। নিউ দিল্লি জেলার উপকমিশনার সচিন শর্মা অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের প্যানেল আয়োজনের জন্য এফসিসির পুলিশের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের কর্মসূচিতেও কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি।
তবে অনুষ্ঠানটির অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে পুলিশের একটি নথি পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিলক মার্গ থানার সিলযুক্ত ওই নথিতে বলা হয়েছে, ‘তথ্য অনুযায়ী কিছু বিতর্কের কারণে এই কর্মসূচি অনুমোদিত নয়।’
এর আগে দিল্লি পুলিশের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সেমিনারটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েনের অনুরোধ করেছিল এফসিসি। চিঠিতে বলা হয়েছিল, শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত এফসিসিতে হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় সেমিনার ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
সেমিনারটি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত না হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিল্লিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং এ ধরনের অনুষ্ঠানে ভারতের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।