রাজধানীর গুলিস্তানের জিপিও মোড়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। কার্যালয়ের ভেতরে থাকা কয়েকশ ব্যক্তিকে আটকের প্রক্রিয়া চলছে বলে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ জানিয়েছে। তবে তাঁদের সবাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তা এখনো যাচাই করা হয়নি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে জাসদ কার্যালয়ে হামলা ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের পর পুলিশ সেখানে অভিযান শুরু করে। বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ কার্যালয়ের তিনতলায় গিয়ে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে দেখতে পায় বলে জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও পরিচয় যাচাইয়ের জন্য থানায় নেওয়া হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের এসআই নাজমুল হোসেন বলেন, কার্যালয়ের ভেতরে প্রায় ৪০০ জনের মতো ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের আটক করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা ৩টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ তিনতলায় জাসদ কার্যালয়ে গিয়ে তাঁদের দেখতে পায়। সেখানে তাঁরা বৈঠক করছিলেন।
তবে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, তখন পর্যন্ত ৩০ থেকে ৪০ জনকে পল্টন থানায় নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, কার্যালয়ের সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল এবং ভেতরে একটি বৈঠক চলছিল—এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অনেককে নিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ৩০-৪০ জন পল্টন থানায় নেওয়া হয়েছে। এখনো আমাদের কার্যক্রম চলছে। পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাসদ কার্যালয়ে কারা অবস্থান করছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় কী এবং সেখানে কী ধরনের বৈঠক হচ্ছিল—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টতার ধরন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অন্যদিকে জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের দাবি, কার্যালয়ে কোনো গোপন বৈঠক হচ্ছিল না। সারাদেশ থেকে আসা জাসদের প্রায় সাড়ে তিনশ নেতা নিয়ে সেখানে প্রতিনিধি সভা চলছিল। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে ঢুকে হামলা চালালে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে প্রতিনিধি সভা চলাকালে তাঁদের ওপর হামলা হয়। তাঁর ভাষ্য, ‘প্রতিনিধি সভায় বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। আমরা অফিসে অবরুদ্ধ আছি। পুলিশ আসছে, হয়তো অ্যারেস্ট করবে।’
জাসদের এই নেতা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে গোপন বৈঠকের অভিযোগও অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, প্রতিনিধি সভায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জাসদের নেতারা এসেছিলেন। সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘এটা মিথ্যা কথা, আমাদের প্রতিনিধি সভা চলছিল। এখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আসবে কেন, একটা কিছু বলে আমাদের ওপর আক্রমণ করাটাই বিষয়।’ তিনি আরও দাবি করেন, বেলা ৩টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের জাসদ কার্যালয় থেকে বের করে দেয়। এরপর জাসদের নেতাকর্মীদের আটক করা শুরু হয়।
এর আগে দুপুর আড়াইটার দিকে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি দল জাসদ কার্যালয়ে প্রবেশ করে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ সময় ঢাকা দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নকে সেখানে ‘নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গোপন বৈঠক করছে’—এমন অভিযোগ করতে দেখা যায়।
এই অভিযোগের বিষয়ে জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীতে অভিযান চালাচ্ছে। এর আগে ঢাকার গুলশানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে পুলিশি অভিযান ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় পরে ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল ডিএমপি। পুলিশের দাবি ছিল, মিছিল ছত্রভঙ্গ করার সময় দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল।
এদিকে জাসদ কার্যালয়ের ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটক ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়েও তাৎক্ষণিকভাবে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলের পুলিশ কর্মকর্তা প্রায় ৪০০ ব্যক্তির উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন, আর ডিএমপির গণমাধ্যম শাখা বিকেল সোয়া ৪টা পর্যন্ত ৩০ থেকে ৪০ জনকে পল্টন থানায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে অভিযান শেষ হওয়ার আগে মোট কতজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পুলিশ বলছে, অভিযান ও যাচাই-বাছাই শেষে যাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা নিষিদ্ধ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাবে, তাঁদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে জাসদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাঁদের কার্যালয়ে চলা প্রতিনিধি সভাকে আওয়ামী লীগের গোপন বৈঠক হিসেবে উপস্থাপন করে হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
জাসদ কার্যালয়ে আসলে কারা ছিলেন, বৈঠকের প্রকৃতি কী ছিল এবং সেখানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীর উপস্থিতি ছিল কি না। এসব বিষয়ে পুলিশের যাচাই-বাছাই ও তদন্তের ফলাফলের ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে। অভিযান চলাকালে কার্যালয়ের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের একাংশকে থানায় নেওয়া অব্যাহত ছিল। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও চলছিল।