জীবনযুদ্ধ

মুমূর্ষু মাকে বাঁচাতে উত্তাল সাগরে ছেলের লড়াই, অক্সিজেন হাতে পাড়ি দিতে হলো চট্টগ্রাম

সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৯
 ছবি:

সাগর তখন উত্তাল। আকাশ কালো করে নেমেছে বৃষ্টি। সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস। বড় বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে স্পিডবোটে। ঢেউয়ের ধাক্কায় কখনো নৌযানটি উঠে যাচ্ছে পানির ওপর, আবার পরক্ষণেই সজোরে আছড়ে পড়ছে নিচে। স্পিডবোটের ভেতর শুয়ে আছেন ৮০ বছরের রওশন আরা। শরীর নিস্তেজ। নাকে অক্সিজেনের নল। পাশে রাখা অক্সিজেনের সিলিন্ডারটিও ঢেউয়ের ঝাঁকুনিতে বারবার পড়ে যাচ্ছে। নাকে লাগানো নল খুলে যাচ্ছে বারবার। আর প্রতিবারই ছুটে গিয়ে সেটি ঠিক করছেন ছেলে জাহাঙ্গীর কবির।

এক পাশে মুমূর্ষু মা, অন্য পাশে উত্তাল সাগর। সামনে অনিশ্চিত পথ। মাকে বাঁচাতে চট্টগ্রাম শহরের হাসপাতালে পৌঁছাতেই হবে। কিন্তু সাগর যেন কিছুতেই পথ ছাড়ছে না। মাকে আগলে, কখনো অক্সিজেনের নল ঠিক করে, কখনো সিলিন্ডার সামলে এভাবেই উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে হয়েছে জাহাঙ্গীরকে। কয়েক ঘণ্টার এই যাত্রা তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল এক অন্যরকম যুদ্ধ।

রোববার ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ধরা পড়ে সেই ভয়ংকর যাত্রার কিছু মুহূর্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে ভিডিওর কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্যের আড়ালে ছিল একটি পরিবারের দীর্ঘ আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা আর অসহায়ত্বের গল্প।

রওশন আরা সন্দ্বীপ পৌরসভার তালতলি বাজারসংলগ্ন ছটাই বাড়ির বাসিন্দা। কয়েক বছর ধরে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন তিনি। শনিবার রাতে হঠাৎ তাঁর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে পরিবারের উদ্বেগও।

রোববার সকালে তাঁকে সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা দ্রুত চট্টগ্রাম শহরের কোনো হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। মায়ের অবস্থা দেখে আর দেরি করার সাহস পাননি জাহাঙ্গীর। সকাল ১০টার দিকে স্বজনদের নিয়ে মাকে সঙ্গে করে চলে আসেন সন্দ্বীপ ঘাটে। লক্ষ্য চট্টগ্রাম শহর।

কিন্তু তখনই সামনে আসে আরেক সংকট। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর একটি স্পিডবোট পাওয়া গেলেও আবহাওয়া ছিল প্রতিকূল। শেষ পর্যন্ত মাকে নিয়ে স্পিডবোটে ওঠেন জাহাঙ্গীর। শুরু হয় সাগর পাড়ি। কিছুদূর যেতেই বদলে যায় পরিস্থিতি। বৃষ্টি বাড়ে, বাতাসের গতিও বাড়তে থাকে। উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকে স্পিডবোটে। প্রতিটি ঝাঁকুনির সঙ্গে যেন বাড়তে থাকে জাহাঙ্গীরের ভয়।

মায়ের নাকে লাগানো অক্সিজেনের নল বারবার খুলে যাচ্ছিল। সিলিন্ডারও পড়ে যাচ্ছিল এদিক-ওদিক। এক হাতে মাকে সামলানো, অন্য হাতে অক্সিজেন ঠিক রাখা আর সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে নৌযানটিতে টিকে থাকা—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

চট্টগ্রাম শহর খুব দূরে নয়। কিন্তু সেদিন সেই পথটুকুই যেন শেষ হতে চাইছিল না। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, কখন পৌঁছাবেন। জাহাঙ্গীরের চোখ তখন বারবার মায়ের দিকে। মায়ের শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক আছে কি না, অক্সিজেনের নল ঠিকমতো লাগানো আছে কি না, সিলিন্ডার পড়ে গেল কি না—সেদিকেই ছিল তাঁর নজর।

অবশেষে বিকেলের দিকে চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছাতে সক্ষম হন তাঁরা। তবে ততক্ষণে কয়েক ঘণ্টার বিলম্বে রওশন আরার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরপরই তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। দ্রুত ভর্তি করা হয় আইসিইউতে।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর অবস্থা এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়। হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় শারীরিক জটিলতা আরও বেড়েছে বলেও জানান তাঁরা। জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টা দেরিতে মাকে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছাতে হয়েছে। স্পিডবোটে মুমূর্ষু মাকে নিয়ে কী কঠিন সময় পার করেছি, তা বলে বোঝাতে পারব না। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, কখনো কল্পনাও করিনি।’ তিনি বলেন, ‘উত্তাল সাগরের সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। সবার মধ্যে ভয় আর আতঙ্ক কাজ করছিল। শুধু মনে হচ্ছিল, কোনোভাবে মাকে নিয়ে শহরে পৌঁছাতে পারি।’

জাহাঙ্গীরের এই দুর্ভোগ শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্দ্বীপের দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ও জরুরি রোগী পরিবহনের সংকট।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মুমূর্ষু রোগীদের নিরাপদে চট্টগ্রামে নেওয়ার জন্য সন্দ্বীপে দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। কিন্তু কোনোটিই বর্তমানে রোগী পরিবহনে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স ২০০৮ সাল থেকে গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে কেওড়াবাগানে পড়ে আছে। এক দিনের জন্যও সেটি রোগী পরিবহনে ব্যবহার করা হয়নি। ২০১৫ সালে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের দেওয়া আরেকটি সি-অ্যাম্বুলেন্সও কখনো চলাচল করেনি। বর্তমানে সেটি পড়ে আছে হারামিয়া ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল প্রাঙ্গণে।

সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস বলেন, দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্সই ব্যবহার অনুপযোগী। নতুন সি-অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

জাহাঙ্গীরের প্রশ্ন, মায়ের মতো একজন মুমূর্ষু রোগীকে যদি চিকিৎসার জন্য উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়েই শহরে নিতে হয়, তাহলে জরুরি সময়ে এই দ্বীপের মানুষের ভরসা কোথায়? 

মাকে নিয়ে সেদিনের সেই কয়েক ঘণ্টা হয়তো জাহাঙ্গীরের জীবনে দীর্ঘদিন মনে থাকবে। উত্তাল ঢেউ, ঝড়-বৃষ্টি আর মায়ের নাকে লাগানো অক্সিজেনের নল—সবকিছু মিলিয়ে সেই যাত্রা তাঁর কাছে ছিল এক দুঃসহ স্মৃতি। তবে তাঁর চাওয়া একটাই—তাঁর মাকে নিয়ে যে যুদ্ধ তাঁকে করতে হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সন্তানকে মুমূর্ষু মা-বাবাকে নিয়ে এমন যুদ্ধে নামতে না হয়।

সূত্র: সমকাল

একবারে পুরো টাকা তুলতে পারবেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা

সংগ্রামের বর্ণিল চরিত্র মাওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁ

পুলিশকে ঢেলে সাজাতে ৩১ হাজার কোটি টাকার বাজেট

জাপানে সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে লড়াইয়ের প্রত্যয় মারিয়াদের

বোলারদের ঘুরে দাঁড়ানোর পর ব্যাটিংয়ে হৃদয়-জাকেরের প্রতিরোধ

প্রত্যাশিত বড় জয়ে এশিয়া কাপ শুরু বাংলাদেশের

উজবেকিস্তানের কাছে হেরে এশিয়ান কাপ বাছাই শুরু বাংলাদেশের যুবাদের

মেসির বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার: এক বিশ্বকাপজয়ী মহাকাব্য

শেষ হলো এক মহাকাব্য, নীল-সাদা জার্সিতে আর দেখা যাবে না মেসিকে

১০

ভারতের বাংলাদেশ সফর নিয়ে এখনও আশা ছাড়ছেন না তামিম

১১

দেশে প্রথম সফল রোবোটিক সার্জারি ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের দাবি

১২

৪৯ বছরে বিএনপি, এখনো পথনির্দেশক শহীদ জিয়ার ১৯ দফা

১৩

দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণই বিএনপির সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস : তারেক রহমান

১৪

গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও জনগণের অধিকার নিশ্চিতে কাজ করেছে বিএনপি : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

১৫

মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কমে গেছে: মান্না

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৪

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত