পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিনটি পৃথক জাতীয় কমিটি বাতিলসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা রাজনৈতিক। তাই নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি না করে সংলাপ ও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর পুরানা পল্টন মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে গণসংযোগ ও প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচি শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো। পরে পল্টন মোড় থেকে বিজয়নগর হয়ে নয়াপল্টন পর্যন্ত গণসংযোগ করেন তাঁরা। এ সময় পথচারীদের মধ্যে প্রচারপত্র বিতরণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে নতুন করে সমস্যা তৈরি করছে বলে তাঁদের অভিযোগ। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসানে চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য দীপক শীলের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাবেক সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি শান্তিদেবী তঞ্চঙ্গ্যা, যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম ও ছাত্রলীগের (জাসদ) সভাপতি গৌতম শীলসহ অন্য নেতারা।
বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়োগ চুক্তির চেতনার পরিপন্থী বলে দাবি করেন তাঁরা।
নেতারা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কার্যক্রম বন্ধ করে বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে চুক্তির ধারাগুলো বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে অর্থবহ সংলাপ আয়োজনের আহ্বান জানান তাঁরা।
আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন; পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহার; মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য চুক্তি অনুযায়ী উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করা; চুক্তি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ; বিধিমালা প্রণয়নসহ দ্রুত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপ আয়োজন; এবং পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিসহ সব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সরকারের উদ্যোগে বহুপক্ষীয় অর্থবহ সংলাপ আয়োজন।
আন্দোলনকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক তিনটি পৃথক জাতীয় কমিটি বাতিলের দাবিও জানান। তাঁদের মতে, চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে পার্বত্য অঞ্চলের সংকট আরও জটিল হতে পারে। তাই চুক্তির চেতনা সমুন্নত রেখে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ, প্রশাসনিক কাঠামো ও আঞ্চলিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘদিনের। এসব সমস্যার সমাধানে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান গঠন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন আন্দোলনের নেতারা। তাঁদের আহ্বান, পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তির বিধান ও স্থানীয় জনগণের অধিকার বিবেচনায় নিতে হবে।