রাতে আত্মীয়দের বাড়িতে থাকছেন মেয়ে ও সৎ বোন; স্থানীয়দের অনেকে কথা বলতে নারাজ, টহল দিচ্ছে পুলিশ
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান ও দাফন ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার রেশ কাটেনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। পিরোজপুরের সদর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামের বাড়িতে ফিরলেও রাতে সেখানে থাকছেন না মেয়ে শিমু ও সৎ বোন হেনা বেগম। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে তাঁরা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে রাত কাটাচ্ছেন। সরাসরি কোনো হুমকি না পেলেও দাফনের সময়কার পরিস্থিতি তাঁদের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
গত শনিবার রাতে চিথলিয়া গ্রামে নিজেদের বাড়িতে গিয়ে এসব কথা জানান শিমু। তিনি বলেন, বাবাকে দাফনের পর মায়ের সঙ্গে গোপালগঞ্জে চলে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার আবার গ্রামের বাড়িতে ফিরেছেন। তবে তাঁর মা মনোয়ারা বেগম এখনও গোপালগঞ্জে আরেক মেয়ের বাসায় রয়েছেন।

পিরোজপুর সদর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর কবর
শিমুর ভাষ্য, কারও কাছ থেকে সরাসরি হুমকি পাননি তাঁরা। কিন্তু বাবার দাফনের সময় যা ঘটেছে, তাতে মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকতে পারছেন না। এ কারণে রাতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকেন তিনি। তাঁর সৎ বোন হেনা বেগমও রাতে নিজের বাড়িতে না থেকে একই গ্রামের মেয়ে বা ছেলের বাড়িতে থাকেন।
মানিক পশারীর পরিবারের এই উদ্বেগ এমন এক ঘটনার পর সামনে এসেছে, যা নিয়ে পিরোজপুরের বাইরেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। ৮৭ বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। গত ২৪ অক্টোবর টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থানকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
দাফনের আগে বাধার অভিযোগ
মানিক পশারীর মরদেহ ২৪ অক্টোবর পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে নেওয়া হলে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের প্রস্তুতি ও নিজ এলাকায় দাফন নিয়ে আপত্তি ওঠে। পরিবারের অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীরা গার্ড অব অনার দেওয়া এবং পিরোজপুরে দাফনের বিরোধিতা করেন। পরিস্থিতির কারণে মরদেহ পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিকেল ৫টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে রাত প্রায় ২টার দিকে পুলিশ পাহারায় চিথলিয়া গ্রামে দাফন সম্পন্ন হয়।
ঘটনার সময় পরিবারের সদস্যদের যে অনিশ্চয়তা ও চাপের মধ্যে পড়তে হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও তাঁদের মধ্যে রয়েছে। দাফনের সময় বাধা দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের অন্ধকারে পরিবারের সদস্যদেরই কবর খোঁড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
তবে অভিযোগের সব দিক এখনও স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ঘটনাটিতে দলের কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে। ফলে অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং তদন্তের ফল আলাদা করে দেখা জরুরি।
ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার স্মৃতি
শিমু জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁদের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি বাবা-মা, বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে গোপালগঞ্জে চলে যান। প্রায় তিন মাস পর থেকে মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়িতে আসতে শুরু করেন। কখনো একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে থাকতেন, আবার কিছুদিন পর গোপালগঞ্জে ফিরে যেতেন।
বাড়িতে আগুন দেওয়ার আগের ঘটনা এবং বাবার মৃত্যুর পর দাফন ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি—দুটিই পরিবারের নিরাপত্তাবোধকে প্রভাবিত করেছে বলে তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়। তবে বর্তমানে তাঁদের কেউ সরাসরি হুমকি দিয়েছেন—এমন অভিযোগ শিমু করেননি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর পুড়িয়ে দেওয়া ঘরের সাক্ষী এই সিঁড়ি
চিথলিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাইরে থেকে এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক। মানুষ দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত, চায়ের দোকানগুলোতেও লোকজনের উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু মানিক পশারীকে নিয়ে প্রশ্ন করলে স্থানীয়দের অনেকেই কথা বলতে চাননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ঘটনাটি নিয়ে কথা বললে ঝামেলায় পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁরা নীরব থাকতে চান। তবে তাঁদের কেউ সরাসরি ভয়ভীতি বা হুমকি পাওয়ার কথা জানাননি। এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে বলেও তাঁদের বক্তব্য।
মানিক পশারীর এক চাচাতো ভাই বলেন, তাঁরা স্বাভাবিকভাবে এলাকায় চলাফেরা করছেন এবং তাঁদের চলাচলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ফলে পরিবারের কয়েকজনের উদ্বেগ ও অন্য স্বজনের স্বাভাবিক চলাচলের অভিজ্ঞতা—দুই ধরনের বক্তব্যই সামনে এসেছে। এ অবস্থায় স্থানীয়ভাবে প্রকৃত নিরাপত্তা পরিস্থিতি বুঝতে পরিবারের উদ্বেগের পাশাপাশি হুমকি বা হয়রানির কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের টহল, অভিযোগ না পাওয়ার কথা
পিরোজপুর সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাধেশ্যাম সরকার বলেন, মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যদের শঙ্কার বিষয়ে থানায় কেউ মৌখিক বা লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ নিয়মিত ওই এলাকায় টহল দিচ্ছে।
পুলিশের এই বক্তব্যে একদিকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে, অন্যদিকে সতর্কতামূলক টহলের কথাও জানানো হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা রাতে আত্মীয়দের বাড়িতে থাকছেন—এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের নির্দিষ্ট কারণ জানা এবং প্রয়োজন হলে অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্তের দাবি মুক্তিযোদ্ধা ও নাগরিকদের
দাফন ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রতিবাদে ৩১ অক্টোবর পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিবাদ সভা করেন। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সভায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেন। বক্তারা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার ও পারিবারিক কবরস্থানে দাফন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রতিবাদ জানান এবং দায়ীদের শনাক্ত করে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন।
এদিকে ৩১ অক্টোবর ২৮ জন নাগরিকও ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন। তাঁদের বক্তব্যে দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। এসব প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি শুধু স্থানীয় বিরোধ হিসেবে নয়, মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় সম্মান এবং নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন হিসেবেও আলোচনায় এসেছে।
এর আগে ২৭ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। কমিটিতে রয়েছেন দলটির নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ও নূরুল ইসলাম বুলবুল। তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনার কথাও দলটির বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। তবে ১ নভেম্বর পর্যন্ত অনুসন্ধানে ওই কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ২৯ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় মানিক পশারীর মৃত্যু, দাফন এবং তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা যাচাইয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানায়। কমিটিকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও সনদ-সংক্রান্ত বিষয় নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ দাফন ঘিরে বাধার অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ও সনদ নিয়েও সরকারি পর্যায়ে যাচাই শুরু হয়েছে। তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সাঈদীর মামলার সাক্ষী ছিলেন মানিক পশারী
মানিক পশারীর পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন। সাঈদী ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
মানিক পশারীর সঙ্গে সাঈদীর মামলার এই যোগসূত্রের কারণে তাঁর মৃত্যু ও দাফন ঘিরে ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। তবে মামলার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা এবং দাফনের সময়কার অভিযোগের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা প্রমাণ ছাড়া ধরে নেওয়া যায় না।
এখন মূল প্রশ্ন—দাফনের দিন ঠিক কী ঘটেছিল, কারা বাধা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ছিলেন, প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বাস্তব কারণ আছে কি না। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর তদন্ত কমিটি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তদন্তে কী উঠে আসে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যরা সরাসরি হুমকির কথা না বললেও রাতে নিজেদের বাড়িতে না থাকার সিদ্ধান্ত তাঁদের অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং পরিবারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়মিত যাচাই—এই তিনটি বিষয়ই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ