‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে শেষবার কথা বলার সময় এ কথাই বলেছিলেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ (২৮)। কিন্তু বৃহস্পতিবার টেকনাফে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। ছেলের মৃত্যুর খবরে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা রেখা বেগম। স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। আর অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য বাবা আফজাল শেখ চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না।
শুক্রবার সকালে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে তিতাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিতাস। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০১৭ সালে সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিতাস। চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে কোনো সন্তান নেই। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সেই অপেক্ষার অবসান হওয়ার আগেই প্রাণ হারালেন তিতাস।
স্বামীকে হারিয়ে বারবার বিলাপ করছেন সুমাইয়া। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলছেন, ‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব! আমার কোনো অস্তিত্ব রইল না! আল্লাহ, আমি এখন কী করব!’
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে আহাজারি করছেন মা রেখা বেগম। তিনি বলেন, বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তিতাস পরদিন বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাওয়ার কথা জানিয়ে দোয়া চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটিই যে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হবে, তা কল্পনাও করেননি তিনি।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে টেকনাফে মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে আহত হন তিতাস। তাঁর বুকের বাঁ পাশে গুলি লাগে।
পরে তাঁকে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তিতাসের মরদেহ রামু সিএমএইচে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার। মরদেহ আনতে সেখানে গেছেন তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেন, যিনিও সেনাবাহিনীতে কর্মরত।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁদের জানানো হয়েছে, আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারে করে শুক্রবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে তিতাসের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা। এরপর বিকেল চারটার মধ্যে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনারসহ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। পরে পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে দাফন করা হবে।