রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে অভ্যন্তরীণ বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা দ্রুত দূর করা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং কাজ শেষ করার জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
রোববার (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভ্যন্তরীণ বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশ দেন। সভায় তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগকে সমন্বিতভাবে প্রকল্পের বিদ্যমান পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলুর বরাত দিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন। দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের সুফল পেতে যেন রাজধানীবাসীকে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর যানজট কমাতে সরকার বিভিন্ন সময়ে সড়ক, উড়ালসড়ক, গণপরিবহন ও জলপথভিত্তিক একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৃত্তাকার সড়ককে রাজধানীর যান চলাচল ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে শহরের ভেতরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সড়কগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং বিকল্প পথে যানবাহন চলাচলের সুযোগ তৈরি করা।
এর আগে জুলাই মাসেও প্রধানমন্ত্রী ঢাকার অভ্যন্তরীণ বৃত্তাকার সড়ক ও প্রায় ১১০ কিলোমিটার বৃত্তাকার নৌপথের কাজ দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তবে রাজধানীর যানজটের সমস্যা শুধু সড়কের পরিমাণ বাড়িয়ে সমাধান করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। সড়ক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন, বাস টার্মিনাল, অবৈধ পার্কিং, পথচারী চলাচল, যানবাহনের শৃঙ্খলা এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সড়ক নির্মাণকে সমন্বিত না করলে নতুন সড়কও একসময় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে পড়তে পারে।
এ বাস্তবতার মধ্যেই সেপ্টেম্বরে দেশের সড়ক নিরাপত্তার চিত্রও উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন। মোট দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। মোট নিহতের হিসাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ৩২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এ ছাড়া ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
দুর্ঘটনার অবস্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ১৭৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ১৪৫টি, গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি এবং শহরের সড়কে ৬৩টি দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। সেপ্টেম্বরে ১৬৮টি দুর্ঘটনা বা ৩৮ শতাংশ ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। ১০৯টি দুর্ঘটনায় পথচারী চাপা বা ধাক্কার শিকার হয়েছেন। ৯৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে এবং ৬১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে একটি যানবাহনের সঙ্গে অন্য যানবাহনের পেছন থেকে সংঘর্ষে।
ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি। সেপ্টেম্বরে এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সর্বোচ্চ ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দুর্ঘটনায় ৬৯১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল, তিন চাকার যান, বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন ধরনের যান রয়েছে।
নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও রয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে দুই পুলিশ সদস্য, একজন সেনা সদস্য, ১৩ জন শিক্ষক, তিনজন সাংবাদিক, দুইজন চিকিৎসক, চারজন প্রকৌশলী, একজন কাস্টমস কর্মকর্তা, একজন বিদেশি নাগরিক, ব্যাংক-বীমার ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী, ১৮ জন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী এবং ২৪ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছিলেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থীও নিহত হয়েছেন।
সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত এবং চারজন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এ জন্য প্রযুক্তির মাধ্যমে গতিসীমা পর্যবেক্ষণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
সংস্থাটি বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, স্বল্পগতির যানবাহনের মহাসড়কে চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতের বিভিন্ন অনিয়মের কথাও উল্লেখ করেছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, সড়ক পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কার, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার এবং রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাসব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে দক্ষ চালক তৈরির পাশাপাশি চালকদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য আলাদা চলাচলের ব্যবস্থা, সব রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত প্রচার এবং সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বিত ব্যবস্থাপনারও সুপারিশ রয়েছে।
ফলে রাজধানীর যানজট কমাতে নতুন সড়ক নির্মাণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি সড়কে প্রাণহানি কমাতে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্পটির সঙ্গে গণপরিবহন, পথচারী ব্যবস্থাপনা, যান নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক নিরাপত্তার সমন্বয় কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, তার ওপরই রাজধানীর যানজট নিরসনে এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।