পরিবর্তিত যুদ্ধের ধরন, সামরিক প্রযুক্তি ও ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই আয়োজনে অংশ নেবেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান
নয় দিনের সরকারি সফরে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। শনিবার (৩ অক্টোবর) তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। সফরের প্রথম পর্বে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে ‘চিফ অব আর্মি সিম্পোজিয়াম’ ও ‘ল্যান্ড ফোর্সেস ইন্টারন্যাশনাল ল্যান্ড ডিফেন্স এক্সপোজিশন ২০২৬’-এ অংশ নেবেন তিনি। পরে মেলবোর্নে ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে যাবেন। সেখানে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি’র (এউএসএ) বার্ষিক সভা ও প্রদর্শনীতে যোগ দেবেন। সফরকালে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
সামরিক-কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সফরটির গুরুত্বের একটি বড় কারণ হলো, দুই দেশেই এমন দুটি আয়োজনে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান অংশ নিচ্ছেন, যেখানে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যুদ্ধের চরিত্র, সামরিক সক্ষমতার পরিবর্তন এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পার্থে অনুষ্ঠিতব্য চিফ অব আর্মি সিম্পোজিয়াম ৭ ও ৮ অক্টোবর। এবারের প্রতিপাদ্য ‘অভিযোজনের জন্য প্রস্তুত’। অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনী বলছে, সমসাময়িক যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাওয়ার বাস্তবতায় একটি সেনাবাহিনীকে পেশাগত প্রতিষ্ঠান, যুদ্ধক্ষম বাহিনী এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান—তিন ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
ল্যান্ড ফোর্সেস ২০২৬-ও একই সঙ্গে সামরিক বাহিনী, সরকার, প্রতিরক্ষা শিল্প, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিদের এক জায়গায় নিয়ে আসছে। ৬ থেকে ৮ অক্টোবর পার্থ কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে অনুষ্ঠেয় এ আয়োজনে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী, বিশেষজ্ঞ সম্মেলন, সামরিক নেতৃত্বের আলোচনা ও পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ থাকছে। ফলে এটি শুধু অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনীর আয়োজন নয়; বরং ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রবণতা বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম।
বিশেষ করে আধুনিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় চালকবিহীন ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, দূরপাল্লার আঘাত, উন্নত যোগাযোগ, সাইবার সক্ষমতা এবং তথ্যনির্ভর যুদ্ধব্যবস্থার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ল্যান্ড ফোর্সেসের সঙ্গে আয়োজিত বিভিন্ন অধিবেশনে স্বয়ংক্রিয় ও চালকবিহীন সামরিক ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। অর্থাৎ সামরিক সক্ষমতা এখন শুধু জনবল ও প্রচলিত অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকছে না; প্রযুক্তি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত সক্ষমতাও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা কীভাবে খাপ খাওয়ানো যায়, তা সরাসরি এ সফরের আলোচ্যসূচি—এমন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য পেশাগত অভিজ্ঞতা ও নতুন ধারণা বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে আন্তর্জাতিক সামরিক যোগাযোগ বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী চার দশকের বেশি সময় ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। সেনাবাহিনীর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক দলে কর্মকর্তাদের পাঠানোর মাধ্যমে এ যাত্রা শুরু হয়। মে ২০২৬ পর্যন্ত ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের মিশনে অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের ৩ হাজার ৬০০-এর বেশি শান্তিরক্ষী বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা যোগাযোগও নতুন নয়। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমুদ্র নিরাপত্তা, শান্তিরক্ষা, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়ে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার ২০২৫–৩০ বাংলাদেশ উন্নয়ন অংশীদারত্ব পরিকল্পনাতেও বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার আগে প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতা। অস্ট্রেলিয়া তার প্রতিরক্ষা নীতিতে স্থল, সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের সমন্বিত সামরিক সক্ষমতা, দূরপাল্লার আঘাত এবং মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীর ২০২৬ সালের কৌশলগত নথিতে উপকূলীয় এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা, দূরপাল্লার আঘাত এবং অংশীদারদের সঙ্গে সক্ষমতা সমন্বয়ের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য মূলত বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশ উভয়েই শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও নিয়মভিত্তিক ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিষয়ে অভিন্ন স্বার্থের কথা বলে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যবিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে আগ্রহী।
অস্ট্রেলিয়া পর্ব শেষে ওয়াশিংটনে সেনাপ্রধানের অংশগ্রহণও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১২ থেকে ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এউএসএ বার্ষিক সভা ও প্রদর্শনীতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদল ও প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমেরিকার সেনাবাহিনী: যৌথ বাহিনীর ভিত্তি’। আয়োজনে ৭৫০টির বেশি প্রদর্শনী থাকার কথা রয়েছে, যেখানে সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য বাহিনী আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রও বিস্তৃত। নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যে সমুদ্র নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, শান্তিরক্ষা, প্রতিরক্ষা বাণিজ্য ও সামরিক প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয় রয়েছে। তবে বর্তমান সফরে কোনো নির্দিষ্ট অস্ত্র ক্রয়, প্রতিরক্ষা চুক্তি বা নতুন সামরিক সমঝোতা হবে—এমন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সফরটিকে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি উচ্চপর্যায়ের সামরিক যোগাযোগ ও পেশাগত মতবিনিময়ের একটি সুযোগ হিসেবে দেখাই তথ্যনির্ভর।
দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যক্তিদের সঙ্গে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বৈঠকগুলো তাই বিশেষ নজর কাড়তে পারে। বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ, শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং পরিবর্তিত যুদ্ধের প্রযুক্তি—এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকার ও নিরাপত্তা বাস্তবতা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রও তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে সেনাপ্রধানের নয় দিনের সফরকে সামরিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপর্ব হিসেবে দেখা যায়। একদিকে পার্থে পরিবর্তিত যুদ্ধের ধরন ও সামরিক অভিযোজন নিয়ে আলোচনা, অন্যদিকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমাবেশ—দুটি আয়োজনই বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের জন্য বৈশ্বিক নিরাপত্তা প্রবণতা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করছে। তবে সফরের বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে বৈঠক ও মতবিনিময় থেকে ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা উন্নয়ন বা দ্বিপক্ষীয় সামরিক যোগাযোগের উদ্যোগ সামনে আসে তার ওপর।