রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের লেখা বই উপহার দেওয়াকে কেন্দ্র করে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নবীন শিক্ষার্থীদের হাতে অন্যান্য উপহারের সঙ্গে গোলাম আযমের লেখা ‘মনটাকে কাজ দিন’ বইটি তুলে দেওয়া হয়। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের একাংশ ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা সমালোচনা করে বলেছেন, এর মাধ্যমে একাত্তরের বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে স্বাভাবিকীকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের বরণ করতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শাখা ছাত্রশিবির। অনুষ্ঠানে নবীন শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উপহারসামগ্রীর সঙ্গে গোলাম আযমের লেখা ‘মনটাকে কাজ দিন’ বইটি দেওয়া হয়। বই বিতরণের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নবীন শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রশিবির জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে তাদের বরণ করেছে, যা প্রশংসনীয়। তবে উপহারসামগ্রীর মধ্যে গোলাম আযমের লেখা বই দেওয়া নিয়ে তিনি আপত্তি জানান। ওই শিক্ষার্থী বলেন, একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য বিতর্কিত হিসেবে চিহ্নিত একজন ব্যক্তির লেখা বই নবীন শিক্ষার্থীদের উপহার হিসেবে দেওয়া নিন্দনীয়।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রাবি শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুলও বিষয়টির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের স্বাভাবিকীকরণের একটি প্রক্রিয়া চলছে। নবীন বরণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ফুয়াদ রাতুল বলেন, এটি কোনো শিক্ষার্থীসুলভ সংগঠনের কর্মকাণ্ড কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে দেশি-বিদেশি কোনো পক্ষের বিনিয়োগ বা প্রভাব আছে কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে তিনি হস্তক্ষেপমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশের পক্ষে মত দেন এবং দেশবিরোধী কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকলে তা তদারকির প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, নবীন বরণের মতো একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক মতাদর্শের বই তুলে দেওয়া উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, গোলাম আযম ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার কারণে ইতিহাসে বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত। তাঁর লেখা বই নবীন শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ও আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে বইটি বিতরণের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে হওয়া বিচার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল বলে তাঁরা মনে করেন। তবে বইটি উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা লেখকের রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে বইটির বিষয়বস্তুকে গুরুত্ব দিয়েছেন। মেহেদী হাসান বলেন, ‘স্বৈরাচার আমলে আদালতকে প্রভাবিত করে অধ্যাপক গোলাম আযমকে শাস্তি দেওয়া হয়। তাঁর লেখা ‘মনটাকে কাজ দিন’ বইটি শিক্ষার্থীদের নেতিবাচক চিন্তা পরিহার করে সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনে সহায়ক। তাই আমরা বইটির লেখকের পরিবর্তে বইয়ের মানকে গুরুত্ব দিয়েছি। এটি শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক চিন্তা করতে সহায়তা করবে।’
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় গোলাম আযমের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয় এবং ২০১৩ সালে তাঁকে বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এদিকে নবীন বরণ অনুষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম।
নবীনদের স্বাগত জানাতে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি একদিকে শিক্ষার্থীদের বরণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, গোলাম আযমের লেখা বই বিতরণের বিষয়টি নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক মতাদর্শের চর্চা নিয়ে বিতর্ক সামনে এনেছে।