দুই বছরে জেএসএস–ইউপিডিএফের ১১৩ সংঘর্ষ, নিহত ৩৫

আধিপত্য ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ

বিশেষ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৯
 ছবি:

পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদা আদায় ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক দুই সশস্ত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি—জেএসএস (সন্তু) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট—ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর মধ্যে সংঘাত থামছে না। গত দুই বছরে তিন পার্বত্য জেলায় এই দুই পক্ষের মধ্যে অন্তত ১১৩টি সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষে ৩৫ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন।

সংস্থাটির গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এসব সংঘর্ষে দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার ২৭৯টি গুলি বিনিময় হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মাসভিত্তিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

গবেষণাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন চলতি বছরের জুলাই ও সেপ্টেম্বরেও খাগড়াছড়ির পানছড়িসহ কয়েকটি এলাকায় জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে নতুন করে গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, মে মাসে গবেষণার হিসাব শেষ হলেও সংঘাতের প্রবণতা এরপরও অব্যাহত রয়েছে।

দুই বছরে ১১৩ সংঘর্ষ

সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত জেএসএস (সন্তু) ও ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর মধ্যে ১১৩টি সংঘর্ষ হয়েছে। এতে নিহত হয়েছেন ৩৫ জন এবং আহত হয়েছেন ৩২ জন। তিন পার্বত্য জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—জুড়ে এসব ঘটনা ঘটেছে।

তথ্য বলছে, সংঘর্ষের মাত্রা মাসে মাসে এক রকম ছিল না। কোনো কোনো সময়ে সংঘর্ষের সংখ্যা কম থাকলেও গুলিবিনিময়ের পরিমাণ ছিল বেশি। আবার কোনো মাসে সংঘর্ষের সংখ্যা বেশি হলেও হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।

২০২৪ সালের অক্টোবরেই দুই পক্ষের মধ্যে পাঁচটি সংঘর্ষের তথ্য পাওয়া যায়। ওই মাসে প্রায় ২ হাজার ৪৯০টি গুলি বিনিময় হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় চারজন আহত এবং সাতজন নিহত হন।

পরবর্তী সময়ে সংঘাতের ধরন ও তীব্রতায়ও পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৫ সালের জুলাই ছিল সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের মাস। ওই মাসে তিন পার্বত্য জেলায় দুই পক্ষের মধ্যে ১৭টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রায় ৫ হাজার ৬০৫টি গুলি বিনিময় হলেও গবেষণায় একজন নিহত ও একজন আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সংঘর্ষের সংখ্যা ও হতাহতের সংখ্যা সব সময় একই অনুপাতে বাড়েনি। কোনো কোনো ঘটনায় দীর্ঘ সময় ধরে গুলিবিনিময় হলেও হতাহতের সংখ্যা কম ছিল। আবার তুলনামূলক কমসংখ্যক সংঘর্ষেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

সংঘাতের কেন্দ্রে আধিপত্য ও চাঁদা

পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদা আদায় এবং নিজ নিজ নিয়ন্ত্রিত এলাকা ধরে রাখার প্রতিযোগিতার কথা উঠে এসেছে। দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অবস্থানগত বিরোধও রয়েছে। জেএসএস (সন্তু) ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে ইউপিডিএফ শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে রাজনীতি করে। এই রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, জনসমর্থন এবং অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের প্রতিযোগিতা রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ এসেছে।

তবে সংঘাতের প্রতিটি ঘটনার কারণ একই—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো কোনো ঘটনায় আধিপত্য বিস্তারকে কারণ বলা হলেও অন্য ঘটনায় প্রতিশোধ, সাংগঠনিক বিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয় সামনে এসেছে।

চলতি বছরেও রক্তপাত

সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হিসাবের শেষ সময় ২০২৬ সালের মে। কিন্তু এরপরও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ৬ জুলাই খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গী ইউনিয়নের মধুমঙ্গলপাড়া এলাকায় জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে গোলাগুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার খবর দেয় একাধিক সংবাদমাধ্যম। পুলিশও ঘটনাটি নিশ্চিত করে।

জুলাইয়ের শেষ দিকেও পানছড়ি ও মাটিরাঙ্গার সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই পক্ষের গোলাগুলির খবর পাওয়া যায়। স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে হতাহতের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি আসে। ফলে এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ধারণে সরকারি তদন্ত ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

সেপ্টেম্বরের শুরুতেও পানছড়ির বিভিন্ন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা গোলাগুলির খবর প্রকাশিত হয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর তারাবন এলাকায় দীর্ঘ সময় গুলিবিনিময়ের খবর পাওয়া গেলেও হতাহতের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব

দুই পক্ষের সংঘর্ষ মূলত নিজেদের সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে হলেও এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দুর্গম এলাকায় গোলাগুলি হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। অনেক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়ে। চাঁদা আদায়ের অভিযোগও পাহাড়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি করছে। পরিবহন, নির্মাণ, ব্যবসা ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন পক্ষের নামে অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাহাড়ের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিবেশের অন্যতম আলোচিত বিষয়।

সংঘাতের পরিসর কি বাড়ছে

দুই বছরে ১১৩টি সংঘর্ষ এবং ৩৫ জন নিহত হওয়ার তথ্যকে শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, অস্ত্রের ব্যবহার এবং পারস্পরিক প্রতিশোধের প্রবণতা।

তবে গবেষণার পরিসংখ্যান এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পৃথক ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র তৈরির ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হিসাব একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংগৃহীত তথ্য; এটি সরকারি কোনো সমন্বিত পরিসংখ্যান নয়। একইভাবে সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয়, কোন পক্ষের সদস্য ছিলেন এবং কার গুলিতে মৃত্যু হয়েছে—এসব বিষয় অনেক ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায় না। ফলে পাহাড়ের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, হাসপাতাল, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।

 শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন প্রশ্ন

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির প্রায় তিন দশক পরও দুই আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র বিরোধ অব্যাহত থাকা পাহাড়ের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে এ ধরনের সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ করা কঠিন। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ, শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন, ভূমি বিরোধের সমাধান এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে হবে।

কারণ সংঘাতের হিসাব যতই ১১৩টি সংঘর্ষ বা ৩৫ জন নিহতের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকুক, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে পাহাড়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবন, অর্থনীতি ও পারস্পরিক আস্থার ওপর। আর সেই আস্থা ফিরিয়ে আনাই পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।

আধিপত্য ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ

নবীন বরণে গোলাম আযমের বই বিতরণ, সমালোচনার ঝড়

নতুন কারা মহাপরিদর্শক ও অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শকের নিয়োগ বাতিল

হুথিদের দখলে কৌশলগত পেরিম দ্বীপ, ট্রাম্পের সাহায্য চাইলেন সৌদি যুবরাজ

মির্জা ফখরুলের শূন্য আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত ১৮ সেপ্টেম্বর

ব্রিকস: পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, দ্বন্দ্বের মাঝেই সমঝোতার রূপরেখা

বাণিজ্য সম্পর্ক ও সীমান্তে শান্তি বজায় রাখায় জোর শি-মোদির

আবার প্রমাণ হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাংস্কৃতিক রাজধানী: এমপি শ্যামল

কলকাতায় সহসাই মিটছে না হোটেল সমস্যা, ভোগান্তিতে বাংলাদেশিরা

১০

শব্দতরঙ্গেই ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

১১

লড়াই করার সান্ত্বনা নিয়ে হোয়াইটওয়াশ হলো পাকিস্তান

১২

ফেডারেশন কাপে আবার একই গ্রুপে বসুন্ধরা কিংস ও মোহামেডান

১৩

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবার কলেজে কনসার্ট বন্ধের দাবি কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের

১৪

শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর ১৫ অনুশাসন বাস্তবায়নে মাঠে শিক্ষা প্রশাসন

১৫

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আগ্রাসন ও একতরফা শুল্ক আরোপের নিন্দায় ১১ দেশ

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৩

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত