- ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন মার্কো রুবিও, আলোচনায় আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা; অক্টোবরের মাঝামাঝি ১০০টির বেশি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে উজবেকিস্তান সফরের প্রস্তুতি
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার অংশ হিসেবে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশসহ ১১টি দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানদের নিয়ে আঞ্চলিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ‘অ্যাম্বাসেডরস রিজিওনাল কনফারেন্স’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। এতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সম্মেলনে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক যোগাযোগ, আঞ্চলিক অগ্রাধিকার এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং মিশনপ্রধানেরা অংশ নেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনও সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় রুবিও বলেন, সার্জিও গোরের আয়োজনে ভারতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছিলেন। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ১১টি দেশের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। রুবিও বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূতেরা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করতে কাজ করছেন।
তবে সম্মেলনে কোন কোন নির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ আলোচ্যসূচি বা যৌথ সিদ্ধান্তের বিবরণ পাওয়া যায়নি। ফলে বাংলাদেশকে ঘিরে কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা উদ্যোগ কিংবা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে দায়িত্ব পালনরত মার্কিন কূটনীতিকদের একত্র করে আঞ্চলিক পর্যায়ে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশ—কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান—জ্বালানি, পরিবহন, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন ও অগ্রাধিকার এক নয়। তবে একই আঞ্চলিক কাঠামোর আওতায় রাষ্ট্রদূতদের বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি ও পারস্পরিক স্বার্থ নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণের তাৎপর্যও এ প্রেক্ষাপটে বিবেচ্য। ওয়াশিংটন ও ঢাকার সম্পর্কের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রম অধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। তবে দিল্লির সম্মেলনে এসব বিষয় আলাদাভাবে আলোচিত হয়েছে কি না, তার নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই বাংলাদেশের বিষয়ে সম্মেলনের তাৎপর্য মূলত আঞ্চলিক কূটনৈতিক যোগাযোগের পরিসরে সীমাবদ্ধ রেখেই মূল্যায়ন করা যুক্তিযুক্ত।
এদিকে মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আরেকটি উদ্যোগ সামনে এসেছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি মার্কো রুবিওর উজবেকিস্তানের সমরকন্দ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। এ সফরে তাঁর সঙ্গে ১০০টির বেশি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল থাকার কথা। সফরের ঘোষিত লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানো।
সমরকন্দ সফরের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে রয়েছে ‘সি৫+১’ কাঠামোর মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠক। এতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নেবেন। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ২০১৫ সালে চালু হওয়া সি৫+১ কাঠামো যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের মধ্যে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
১০০টির বেশি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ সফরটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও তুলে ধরে। কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি ব্যবসা ও বিনিয়োগকে সামনে রেখে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণে ওয়াশিংটনের আগ্রহ এতে প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে সফরের আগে যেসব পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে, সেগুলোকে সম্ভাব্য কর্মসূচি হিসেবেই দেখতে হবে; সফরে কী চুক্তি হবে বা কত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত আসবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
দিল্লির সম্মেলন এবং সমরকন্দে পরিকল্পিত সি৫+১ বৈঠক একই আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হলেও দুটি উদ্যোগের উদ্দেশ্য এক নয়। দিল্লির সম্মেলনে বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালনরত মার্কিন কূটনীতিকদের একত্র করা হয়েছে। অন্যদিকে সমরকন্দের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় দিল্লির সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। এতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের অংশগ্রহণ ঢাকার সঙ্গে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক কূটনৈতিক যোগাযোগের পরিসর তুলে ধরে। তবে সম্মেলনের প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য এর পরবর্তী সিদ্ধান্ত, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং সমরকন্দের বৈঠকে গৃহীত উদ্যোগের দিকে নজর রাখতে হবে।