যৌথ সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও অস্ত্র সরবরাহের বিধান; অনুমোদনের অপেক্ষায় তুরস্কের পার্লামেন্টে
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ্যে এসেছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের কোনো একটির ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আক্রান্ত দেশকে অবিলম্বে সহায়তা করবে অন্য দুই দেশ। সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এবং অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জ্বালানি সরবরাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৬টি অনুচ্ছেদে বিধান রাখা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই ২০ অক্টোবর চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করে। এর আগে তুরস্ক সরকার অনুমোদনের জন্য চুক্তির নথি দেশটির পার্লামেন্টে জমা দেয়। ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় তিন দেশের নেতারা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তিটি তিন দেশের মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ। এর লক্ষ্য নিজেদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করা। তবে চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে সম্ভাব্য শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
এক দেশের ওপর হামলা, সবার ওপর হামলা
চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে তিন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত রক্ষায় সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কোনো সদস্যদেশের সার্বভৌমত্ব বা সীমান্ত হুমকির মুখে পড়লে সেই হুমকি দূর করতে প্রয়োজনীয় সব উপায় অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্যদেশের ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যদেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কোনো দেশ অন্য রাষ্ট্র বা একাধিক রাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে বাকি সদস্যদেশগুলো অবিলম্বে তাকে সহায়তা করবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো পরিস্থিতিতে তিন দেশকে একই ধরনের বা সমপরিমাণ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সহায়তার ধরন ও পরিধি নির্ধারণ করা হবে পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের ভিত্তিতে। সদস্যদেশগুলো তাদের হাতে থাকা সামরিক সক্ষমতা ও অন্যান্য সম্পদের সীমার মধ্যে থেকে সহযোগিতা করবে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকারের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এই বিধানের সঙ্গে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থার (ন্যাটো) পঞ্চম অনুচ্ছেদের তুলনা করা হচ্ছে। ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদেও এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে মক্কা চুক্তিকে ন্যাটোর সমতুল্য সামরিক জোট বলা এখনই যথাযথ হবে না। দুই চুক্তির ভাষা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা এক নয়। মক্কা চুক্তিতে সহায়তার পরিধি নির্ধারণে সদস্যদেশগুলোর মূল্যায়ন ও সক্ষমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ
চুক্তির তৃতীয় থেকে সপ্তম অনুচ্ছেদে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। এতে তিন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন, যৌথ প্রশিক্ষণ, সামরিক মহড়া এবং পারস্পরিক কার্যক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, শান্তিকাল ও যুদ্ধকাল—উভয় সময়েই প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জনবল বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রম উৎসাহিত করা হবে। এর লক্ষ্য তিন দেশের সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি, দক্ষতা ও পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানো।
সপ্তম অনুচ্ছেদে প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের যৌথ উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কথাও বলা হয়েছে।
দশম অনুচ্ছেদে অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিধান রাখা হয়েছে। সরবরাহ ও পরিবহনের ব্যবস্থা এবং পারস্পরিক সামঞ্জস্য থাকলে শান্তিকাল, যুদ্ধকাল ও জরুরি পরিস্থিতিতে এক দেশ অন্য দেশকে রসদ সহায়তা দিতে পারবে।
এই বিধানগুলো বাস্তবায়িত হলে তিন দেশের সামরিক সরবরাহব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে চুক্তিতে এসব সহযোগিতার কাঠামো নির্ধারণ করা হলেও নির্দিষ্ট অস্ত্র সরবরাহ, যৌথ উৎপাদন বা সামরিক প্রকল্পের বিস্তারিত আলাদা চুক্তি বা প্রটোকলের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে।
গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা
চুক্তির চতুর্থ ও পঞ্চম অনুচ্ছেদে নিরাপত্তাবিষয়ক পরামর্শ, অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। কোনো হুমকি বা বিপদ দেখা দিলে তিন দেশ নিজেদের মধ্যে মূল্যায়ন বিনিময় করে পৃথক বা যৌথ পদক্ষেপ নিতে পারবে।
নবম অনুচ্ছেদে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। পারস্পরিক সম্মতিতে নির্ধারিত নিরাপদ যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তথ্য বিনিময় করা হবে। একই সঙ্গে তথ্যের নিরাপত্তা, উপাত্তের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে গোপনীয় তথ্য ও নথি সুরক্ষার বিষয়ে আরও বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে। চুক্তির আওতায় পাওয়া গোপনীয় তথ্য সদস্যদেশগুলোর বাইরের কোনো রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে বিনিময় করা যাবে না। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র থাকা এবং তথ্য জানার যৌক্তিক প্রয়োজন রয়েছে—এমন ব্যক্তিদেরই এসব নথিতে প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বছরে দুইবার বৈঠক, সৌদি আরবে সচিবালয়
চুক্তির অষ্টম অনুচ্ছেদে তিন দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পরিচালনার জন্য ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠনের বিধান রয়েছে। এতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানেরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
কমিটির কাজ হবে যৌথ প্রতিরক্ষার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, নিরাপত্তা সহযোগিতা উন্নত করা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সময় দেখা দেওয়া বাধা মোকাবিলা করা। কমিটি বছরে দুবার বৈঠক করবে। পালাক্রমে তিন দেশ বৈঠকের আয়োজন করবে। প্রয়োজন মনে করলে দেশগুলোর নেতারাও বছরে একবার বৈঠক করতে পারবেন।
কমিটির কার্যক্রমে সহায়তা করতে সৌদি আরবে সদর দপ্তরসহ একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সচিবালয়ের প্রধান হিসেবে তিন দেশের মধ্যে পালাক্রমে তিন বছরের জন্য একজন মহাসচিব নিয়োগ করা হবে। প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের নাগরিক।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, মূল তিন দেশের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে অন্য দেশকে এই কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার পদ্ধতি নির্ধারণ করা যাবে। তবে নতুন সদস্য যুক্ত করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন তথ্য চুক্তির প্রকাশিত পাঠে নেই।
চুক্তির মেয়াদ অনির্দিষ্ট, সরে যাওয়ার সুযোগ ১০ বছর পর
চুক্তির ১১ থেকে ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে আইনি ভিত্তি, গোপনীয়তা, বিরোধ নিষ্পত্তি, সংশোধন, অনুমোদন এবং মেয়াদসংক্রান্ত বিধান রাখা হয়েছে।
চতুর্দশ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, চুক্তির ব্যাখ্যা বা বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সদস্যদেশগুলো আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে তা বন্ধুত্বপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করবে। পঞ্চদশ অনুচ্ছেদে মূল তিন দেশের পরামর্শ ও সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চুক্তি সংশোধনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ষোড়শ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি দেশকে নিজ নিজ আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে চুক্তিটি অনুমোদন করতে হবে। তিন দেশের মধ্যে সর্বশেষ অনুমোদনের দলিল নির্ধারিত সচিবালয়ে জমা দেওয়ার তারিখ থেকে এটি কার্যকর হবে। চুক্তির নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ নেই। তবে কার্যকর হওয়ার ১০ বছর পার হলে কোনো দেশ চুক্তি থেকে সরে যেতে পারবে। সে ক্ষেত্রে অন্য সদস্যদেশগুলোকে কূটনৈতিক চ্যানেলে অন্তত তিন মাস আগে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
চুক্তি থেকে কোনো দেশ সরে গেলেও তার আগে সম্মতিতে চলমান প্রকল্প বা কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে না। গোপনীয় তথ্য ও নথি সুরক্ষার দায়িত্বও চুক্তির অবসান বা কোনো দেশের প্রত্যাহারের পর বহাল থাকবে।
তুরস্কের পার্লামেন্টে অনুমোদন, সৌদিতে সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ এবং তুরস্কের পার্লামেন্টে তা জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এর বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টে পাঠানো হয়েছে। এরপর ২১ অক্টোবর রয়টার্স জানায়, তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল একে পার্টির এক আইনপ্রণেতা বলেছেন, চুক্তি অনুমোদিত হলে সৌদি আরবে তুর্কি সেনা মোতায়েনের অনুমতি চেয়ে আলাদা প্রস্তাব পার্লামেন্টে তোলা হতে পারে। অর্থাৎ চুক্তির অনুমোদন এবং সেনা মোতায়েনের অনুমতি পৃথক প্রক্রিয়া হতে পারে।
এই উদ্যোগের আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর হামলার ঝুঁকির মধ্যে দেশটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে চাইছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের ওপর হুতি হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে তিন দেশের প্রতিরক্ষা সমন্বয় ও সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে মক্কা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠীকে শত্রু হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় নতুন চুক্তিটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আগ্রহও বেড়েছে। তবে মক্কা চুক্তির আওতায় তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা কী হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
সব মিলিয়ে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি তিন দেশের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকে একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনার উদ্যোগ। যৌথ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন ও রসদ সহায়তার বিধান এর মূল ভিত্তি। তবে চুক্তির বাস্তব প্রভাব নির্ধারিত হবে অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এবং সদস্যদেশগুলো কীভাবে এর বিধান প্রয়োগ করে, তার ওপর।