ভোটের আগে বিচার বিভাগের বিতর্কিত হস্তক্ষেপ, ট্রাম্পের সামনে ক্ষমতার বড় পরীক্ষা, ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০ হাজার ডাকভোট নিয়ে মামলা, আলাস্কায় ফল প্রত্যয়নে বাধা দেওয়ার চেষ্টা; আদালতে ধাক্কা খেল বিচার বিভাগ, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে সামনে এল নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে বিচার বিভাগের বিতর্কিত তৎপরতায়। ভোটের আগেই ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০ হাজার ডাকযোগে আসা ব্যালট নিয়ে মামলা, আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং ফল প্রত্যয়নে বাধা দেওয়ার আবেদন—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নিজেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে কি না।
৩ নভেম্বরের (মঙ্গলবার) মধ্যবর্তী নির্বাচন এমনিতেই ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের পাশাপাশি এই ভোট তাঁর নীতি, জনপ্রিয়তা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপরও জনমতের ইঙ্গিত দেবে। কিন্তু ভোটের আগমুহূর্তে বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নির্বাচনের তাৎপর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, এখানে শুধু কোন দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাবে, তা নয়; নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০ হাজার ব্যালট নিয়ে বিতর্ক
ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট বাতিল বা গণনার বাইরে রাখার আবেদন করেছে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ। সরকারের দাবি, এসব ভোটারের অনেকে মার্কিন নাগরিক নন এবং তাঁদের ভোট দেওয়ার যোগ্যতা নেই। এ-সংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি রাজ্যটির কাছে নথিপত্রও চাওয়া হয়েছে একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে।
অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রশাসন বলছে, অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে রাজ্যে ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের আপত্তি শুধু অভিযোগের সত্যতা নিয়ে নয়; ভোটারদের নাগরিকত্ব সম্পর্কে ফেডারেল সরকারের সন্দেহের ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক ব্যালটের ভাগ্য নির্ধারণের এখতিয়ার নিয়েও। বিচার বিভাগের এই মামলাটি আদালতে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। <Cite refs={["turn352130view0","turn902508search37"]} />
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, অমার্কিন নাগরিকদের ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, কোনো ভোটারকে অযোগ্য মনে হওয়া এবং তাঁর ভোট আইনসম্মতভাবে বাতিল করার মধ্যে প্রক্রিয়াগত পার্থক্য রয়েছে। নাগরিকত্ব যাচাইয়ের দাবি নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তি অবৈধভাবে ভোট দিয়েছেন। একইভাবে, অভিযোগের ভিত্তিতে সব ব্যালট বাতিলের সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায্য হয়ে যায় না। প্রমাণ, আইনি এখতিয়ার এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া—তিনটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ভোটের ঠিক আগে এ ধরনের মামলা ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বিশেষত, ডাকযোগে ভোটের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব বা নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশ্ন নিষ্পত্তি না হলে ভোটারদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এ থেকে সরাসরি বলা যায় না যে কোনো নির্দিষ্ট দলের ভোট কমানোই মামলার উদ্দেশ্য ছিল। সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে প্রশাসনের পদক্ষেপ, উপস্থাপিত প্রমাণ এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ বিবেচনা করতে হবে।
আলাস্কায় ফল প্রত্যয়নের আগেই আইনি বাধার চেষ্টা
বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে আলাস্কায়। সেখানে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের সঙ্গে একই নামের এক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগের অভিযোগ, দ্বিতীয় প্রার্থী ড্যানিয়েল জে. সুলিভানকে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে নির্বাচনে দাঁড় করানো হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ফৌজদারি তদন্তও চলছে।
বিচার বিভাগ এমনকি ড্যান সুলিভান অল্প ব্যবধানে হেরে গেলে নির্বাচনের ফল প্রত্যয়ন ঠেকানোর আবেদনও করেছিল। কিন্তু ফেডারেল বিচারক শ্যারন গ্লিসন ১ নভেম্বর মামলাটি খারিজ করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণের সারকথা ছিল, বিচার বিভাগ এমন কোনো কার্যকর পরিকল্পনা দেখাতে পারেনি, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যালট আলাদা করে পরীক্ষা করা যাবে এবং একই সঙ্গে ভোটের গোপনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকবে। আদালত আরও মনে করেছে, এ ধরনের আদেশ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিচার বিভাগ ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
এখানে অভিযোগ এবং প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। একই নামের প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটার বিভ্রান্তির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে—কিন্তু সেটি একাই ষড়যন্ত্র প্রমাণ করে না। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেল্টোলার প্রচারশিবির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রয়টার্স ও সিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় কাউকে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়নি। ফলে তদন্তের বিষয়বস্তু এবং আদালতে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে এক করে দেখা যায় না।
আলাস্কার মামলাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে শুধু তদন্তের প্রশ্ন ছিল না; নির্বাচনের ফল কীভাবে এবং কখন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাবে, সেটিও বিচার বিভাগের আবেদনের আওতায় এসেছিল। ফল প্রত্যয়ন একটি নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ। ভোট গণনার আগে বা ফল প্রকাশের আগেই আদালতের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরাজয়ের ক্ষেত্রে প্রত্যয়ন আটকে দেওয়ার চেষ্টা নির্বাচনী ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে—যদিও আদালত সেই আবেদন খারিজ করেছে।
বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। ফেডারেল সরকার নির্বাচনী আইন প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি ও সময় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সতর্কতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষত, কোনো প্রার্থী বা দলের সুবিধা-অসুবিধার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নির্বাচনী তদন্তে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তা শুধু একটি মামলার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই নয়, গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনআস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের নির্বাচনী দুর্নীতিসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ শাখার ভূমিকা কমানো হয়েছে এবং নির্বাচনী তদন্তে আগে যে পরামর্শ ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা ছিল, তার কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে নির্বাচনের ফল প্রত্যয়ন না হওয়া পর্যন্ত হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হতো। বর্তমান প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ে সমাধান না হওয়া বিরোধ নিষ্পত্তি করা বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্বাভাবিক দায়িত্বের অংশ। <Cite refs={["turn352130view0"]} />
এই পরিবর্তনকে ঘিরে বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো—আইন প্রয়োগের ক্ষমতা কি প্রমাণভিত্তিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের ভূমিকা বেড়ে যাওয়ায় নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে? শুধু প্রশাসনের বক্তব্য বা সমালোচকদের অভিযোগের ভিত্তিতে এর চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া যায় না। তবে একাধিক অঙ্গরাজ্যে ভোটের আগে মামলা, তদন্ত এবং ফল প্রত্যয়ন নিয়ে আইনি তৎপরতা সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
মার্ক ব্লুমবার্গ, যিনি আগে বিচার বিভাগের নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত নির্বাচনী সুরক্ষা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পরে রুল অব ল প্রজেক্ট প্রতিষ্ঠা করেছেন, রয়টার্সকে বলেছেন, বর্তমান প্রশাসন বিচার বিভাগকে এমন প্রভাবের মধ্যে আনতে চাইছে, যা আগে নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হতো। বিপরীতে, অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ ও বিচার বিভাগের মুখপাত্রের বক্তব্য—তাদের পদক্ষেপ আইন প্রয়োগ এবং ভোটের স্বচ্ছতা রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যই এখন বিতর্কের কেন্দ্র।
২০২০ সালের অভিজ্ঞতা এবং নির্বাচনী আস্থার সংকট
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকেরা ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছিলেন। সেই পরাজয় চ্যালেঞ্জ করে ৬০টিরও বেশি মামলা করা হলেও সেগুলো সফল হয়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম মেয়াদে বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা নির্বাচনের ফল পাল্টানোর উদ্দেশ্যে বিভাগকে ব্যবহারের রাজনৈতিক চাপ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। স্বাধীন তদন্ত ও অঙ্গরাজ্যগুলোর নিরীক্ষাতেও ব্যাপক জালিয়াতির দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই ইতিহাস বর্তমান বিতর্কের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ; কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই রাজনৈতিক বক্তব্যে সেটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে ফলের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি আইনের প্রয়োগ, দ্বিতীয়টি নির্বাচনী আস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আলাস্কার ঘটনায় আদালত সরকারের আবেদন খারিজ করেছে—এটি বিচার বিভাগের স্বাধীন পর্যালোচনার একটি উদাহরণ। অর্থাৎ প্রশাসন মামলা করলেই তার দাবি কার্যকর হয়ে যায় না; আদালতকে এখতিয়ার, প্রমাণ এবং সম্ভাব্য আদেশের বাস্তবতা বিবেচনা করতে হয়। ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাস্কার মামলায় আদালতের হস্তক্ষেপ তাই শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের ওপর আইনি পরীক্ষা নয়, ক্ষমতার পৃথকীকরণ ব্যবস্থারও পরীক্ষা।
ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও অর্থনৈতিক চাপ
বিচার বিভাগের বিতর্কের পাশাপাশি মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক পটভূমিও গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্স/ইপসোসের ২ নভেম্বর প্রকাশিত জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন ছিল ৩২ শতাংশ। কংগ্রেস নির্বাচনে কোন দলকে সমর্থন করবেন—এমন প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটরা ৪৬ শতাংশ এবং রিপাবলিকানরা ৩৮ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৮ শতাংশ ভোটার বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটদের ওপর আস্থা ছিল ৪৩ শতাংশের, রিপাবলিকানদের ওপর ৩২ শতাংশের। জরিপটি ১ হাজার ৭৬৫ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর অনলাইনে পরিচালিত হয়; এর ত্রুটিসীমা ছিল দুই শতাংশ পয়েন্ট।
এই পরিসংখ্যান ডেমোক্র্যাটদের জন্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করে না। জাতীয় পর্যায়ের জরিপে কোনো দলের প্রতি সামগ্রিক সমর্থন এবং নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্য বা নির্বাচনী এলাকার ফল এক বিষয় নয়। বিশেষত, প্রতিনিধি পরিষদের প্রতিটি আসনে আলাদা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সিনেট নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ভোটের গুরুত্ব রয়েছে। ফলে জাতীয় জরিপের ব্যবধান সরাসরি আসনসংখ্যায় রূপান্তরিত হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়।
তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, অর্থনৈতিক নীতি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য চাপ তৈরি করছে। ট্রাম্প নিজে ব্যালটে না থাকলেও তাঁর প্রশাসনের কাজকর্মের মূল্যায়ন ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই নির্বাচন কংগ্রেসের আসন বণ্টনের পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের নীতি ও নেতৃত্ব সম্পর্কে জনমতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালে কী পাল্টাবে
নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি আসন ছিল; একজন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে অবস্থান করতেন এবং দুটি আসন শূন্য ছিল। এই অবস্থায় ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন নিট বাড়াতে পারলে তাঁরা ২১৮ আসনে পৌঁছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবেন। সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা দুজন স্বতন্ত্র সদস্য মিলিয়ে কার্যত ৪৭টি আসন রয়েছে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে তারা কমিটিগুলোর নেতৃত্ব পাবে, প্রশাসনের নীতি নিয়ে তদন্ত করতে পারবে এবং নথিপত্র তলব বা কর্মকর্তাদের শুনানিতে ডাকার উদ্যোগ নিতে পারবে। বাজেট ও ব্যয়সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে তাদের প্রভাব বাড়বে। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাবও প্রতিনিধি পরিষদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হতে পারে; তবে অভিশংসন মানেই পদ থেকে অপসারণ নয়। সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করে অপসারণের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং নিয়োগ কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। তবে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন ক্ষমতা দেয় না। আদালতের পর্যালোচনা, সংবিধান, অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার সীমা থেকেই যায়। কোনো একটি কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলেও তারা এককভাবে সব নীতি বাতিল করতে পারবে না; আবার রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলেও প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বাধাহীনভাবে বাস্তবায়িত হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
নির্বাচনের বাইরেও বড় প্রশ্ন
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যাই হোক, ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাস্কার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: নির্বাচনের সততা রক্ষার দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নিজেদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করবে? ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই তদন্তের সময়, পদ্ধতি এবং আইনি ভিত্তি এমন হওয়াও জরুরি, যাতে কোনো দল বা প্রার্থীর সুবিধা দেওয়ার সন্দেহ তৈরি না হয়।
বিচার বিভাগ বলছে, তারা আইন প্রয়োগ করছে; সমালোচকদের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগেই এমন পদক্ষেপ ভোটের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ বাড়াতে পারে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রমাণ, আদালতের পরবর্তী রায় এবং প্রশাসনের পদক্ষেপের ওপর। তবে ভোটের আগে ফল প্রত্যয়ন ঠেকানোর আবেদন এবং বিপুলসংখ্যক ব্যালট নিয়ে মামলা ইতোমধ্যেই নির্বাচনী বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
ট্রাম্পের জন্য এই নির্বাচন তাই শুধু কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াই নয়। এটি তাঁর প্রশাসনের প্রতি জনসমর্থন, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা—সব কিছুর ওপর একসঙ্গে পরীক্ষা। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে না; কিন্তু তদন্ত, বাজেট ও আইন প্রণয়নে নতুন বাধার মুখে পড়তে পারেন তিনি। আর রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হবে, যদিও বিচার বিভাগ ও নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিটে যাবে না।
শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের শক্তি শুধু কে নির্বাচনে জিতল, তার ওপর নির্ভর করে না। ভোটাররা যেন ভয় বা বিভ্রান্তি ছাড়া ভোট দিতে পারেন, অভিযোগের নিষ্পত্তি যেন প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে দায়িত্ব পালন করে—এই আস্থাই নির্বাচনের ফলের মতো গুরুত্বপূর্ণ।