হিজাব পরা প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন আবের কাওয়াস। যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভায় নির্বাচিত অল্পসংখ্যক ফিলিস্তিনি-আমেরিকানের তালিকায় যুক্ত হলেন তিনি। শ্রমিক ও অভিবাসীদের অধিকার এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে উঠে এসেছেন এই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটের ১২ নম্বর আসনে জয় পেয়েছেন কাওয়াস। ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে তিনি পেয়েছেন ৭৫ শতাংশ ভোট। এ ফলের ভিত্তিতে তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করে নিউইয়র্ক টাইমস। জয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় কাওয়াস লেখেন, ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি।’
মামদানির মিত্র কাওয়াস
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থি অংশের প্রভাবশালী সংগঠন ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার (ডিএসএ) সদস্য কাওয়াস। একই সংগঠনের সদস্য জোহরান মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনেও ডিএসএর একাধিক প্রার্থী জয় পেয়েছেন।
কাওয়াসের নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন দিয়েছেন মামদানি, সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিবসহ বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট। তাঁর জয়কে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনপন্থি গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অধিকারকর্মী থেকে রাজনীতিবিদ
রাজনীতিতে আসার আগে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে শ্রমিকদের অধিকার, অভিবাসী জনগোষ্ঠী এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন কাওয়াস।
গত মাসে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ২০২৩ সালে একদল অধিকারকর্মীর জোটের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এমন অর্থায়ন বন্ধ করাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য, যা ইসরায়েল রাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দেশটির সামরিক দখলদারত্বকে সহায়তা করে।
কাওয়াসের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি দাতব্য সংস্থার সন্ধান পান, যেগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের জন্য ইহুদি-আমেরিকানদের অধিকৃত পশ্চিম তীরে পাঠাতে লাখো ডলার সংগ্রহ করেছিল। নিউইয়র্কের অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নে এ ধরনের সংগঠনের সম্পৃক্ততা বন্ধের লক্ষ্যে ‘নট অন আওয়ার ডাইম’ নামের প্রচারণায় সহায়তা করেন তিনি।
অভিবাসী পরিবারের সন্তান
নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়া ফিলিস্তিনি বাবা-মায়ের সন্তান কাওয়াস। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্রুকলিনে। তিনি জানিয়েছেন, শৈশবে তাঁর বাবা-মায়ের বৈধ অভিবাসন নথি না থাকলেও প্রতিবেশীরা তাঁদের আপন করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন কাওয়াস ও তাঁর পরিবার।
নিউইয়র্কের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নজরদারি, বহিষ্কার কিংবা সন্ত্রাসবাদের ভিত্তিহীন অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার ভয় ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানান তিনি। এর প্রভাব পড়ে তাঁর স্কুলজীবনেও। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহপাঠীরা তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে।
হাইস্কুলে পড়ার সময় কাওয়াসের বাবা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের হাতে আটক হন। পরে তাঁকে জর্ডানে বহিষ্কার করা হয়। এ ঘটনায় পরিবারটি অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নিজের অভিজ্ঞতার কারণে অভিবাসীদের অধিকার রক্ষার বিষয়টিও কাওয়াসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ‘নিউইয়র্ক ফর অল অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে আইসের সঙ্গে নিউইয়র্কের সহযোগিতা বন্ধের অঙ্গীকার করেছেন তিনি। প্রস্তাবিত এ আইনে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বেসামরিক অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতা নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
ফিলিস্তিনের পক্ষে সরব
‘ফিলিস্তিনের প্রশ্ন ছাড়া অন্য সব বিষয়ে প্রগতিশীল’—এমন রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে আসছেন কাওয়াস। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের আগের পরিস্থিতি নিয়ে মিডল ইস্ট আইকে তিনি বলেন, তখন অনেকের ধারণা ছিল, রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়তে হলে ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা যাবে না। ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বললে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে—এমন ভয়ও ছিল।
নির্বাচনী প্রচারেও নিজের ফিলিস্তিনি পরিচয় তুলে ধরতে পিছপা হননি কাওয়াস। চলতি বছরের শুরুর দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফরের প্রতিবাদে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হন তিনি। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া কয়েক ডজন ব্যক্তির মধ্যে ছিলেন কাওয়াস। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর বিজয় দেশটির আইনসভায় ফিলিস্তিনি-আমেরিকান প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। একই সঙ্গে অভিবাসী অধিকার, শ্রমিক অধিকার ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে দীর্ঘদিনের আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন অধিকারকর্মীর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়ে ওঠার ঘটনাও সামনে এনেছে।