যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে রিপাবলিকান দল। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধনীতি নিয়ে দলের ভেতরেই অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। একসময় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও যুদ্ধের সমর্থক হিসেবে পরিচিত নেতাদের কেউ কেউ এখন সংঘাতের দীর্ঘসূত্রতা ও এর রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সরাসরি ইরান যুদ্ধকে নির্বাচনে পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমাদের পরাজয়ের মূল কারণ এই যুদ্ধ। গত রাতে প্রেসিডেন্টও এ কথা বলেছেন।’
এত দিন কট্টর ইরানবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত সিনেটর টেড ক্রুজও যুদ্ধের পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। বুধবার নিজের পডকাস্টে তিনি বলেন, সংঘাতটি সংক্ষিপ্ত, চূড়ান্ত ও দ্রুত শেষ হওয়া উচিত ছিল।
তবে নির্বাচনে পরাজয়ের পরও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি ট্রাম্প। ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি সঠিক কাজটিই করেছি। আবারও সুযোগ এলে একই সিদ্ধান্ত নিতাম।’
তাহলে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ নেতারা কেন যুদ্ধনীতি থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন? এর ফলে ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত জে ডি ভ্যান্সকে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি মনে করা হয়। নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর রাজনৈতিক মূল্য কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল।
ভ্যান্সের দাবি, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া অনেক ভোটার এবার ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করেছেন। তাঁদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ইরান যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আনা।
অন্যদিকে, টেড ক্রুজের আপত্তির জায়গা যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা। গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচিত একটি খসড়া অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান পুনর্গঠনের জন্য ৩০ হাজার কোটি ডলারের তহবিলের প্রস্তাব ছিল। ক্রুজসহ রিপাবলিকান দলের রক্ষণশীল আইনপ্রণেতারা এর বিরোধিতা করেন। ক্রুজের বক্তব্য, কোনো পরিস্থিতিতেই ইরানের শাসকদের হাতে বিপুল অর্থ তুলে দেওয়া উচিত নয়। শেষ পর্যন্ত ওই অস্ত্রবিরতি চুক্তিও কার্যকর হয়নি।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প অবশ্য স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতেই সামরিক অভিযান প্রয়োজন ছিল।
কেন এই দূরত্ব
ট্রাম্প দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচনে তাঁর আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় রিপাবলিকান দলের পরবর্তী নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা এখন থেকেই শুরু হয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় ভ্যান্সের পাশাপাশি ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের নামও আলোচনায় রয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। এ পর্যন্ত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানির বাড়তি দাম এবং প্রাণহানির রাজনৈতিক দায়—সব মিলিয়ে রিপাবলিকান নেতাদের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে দলের অবস্থান ধরে রাখতে তাঁদের কেউ কেউ এখন যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখছেন।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল-জাজিরাকে বলেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান দলের ভেতরে বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি হয়েছে। টেড ক্রুজ কিংবা প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো নেতারা দীর্ঘদিন ইরানে হামলার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধটি এখন তাঁদের জন্য দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। সরাসরি যুদ্ধের বিরোধিতা না করে তাঁরা এর পরিচালনা ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
ভ্যান্সের অবস্থান অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। তিনি আন্তর্জাতিক সংঘাত এড়িয়ে চলার পক্ষে। ট্রাম্পের মূল সমর্থকগোষ্ঠীর কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতেও তিনি যুদ্ধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার বিভাগের অধ্যাপক নাতাশা লিন্ডস্টেট বলেন, ভ্যান্স শুরু থেকেই ইরান যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না। তাঁকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে সংঘাত অবসানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আনা হয়েছিল। এখন তিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে দ্বিধা করছেন না।
লিন্ডস্টেটের মতে, অন্য রিপাবলিকান নেতারাও বুঝতে পারছেন, ট্রাম্পের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন তাঁদের রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সাবেক রিপাবলিকান কর্মকর্তা জন ফিহেরি বলেন, ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। ভ্যান্স ও রন ডিস্যান্টিস এ দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। তবে নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পেছনে শুধু ইরান যুদ্ধ নয়; জ্বালানির উচ্চমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা সংকট এবং প্রশাসনের দুর্নীতির অভিযোগও ভূমিকা রেখেছে।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য পদক্ষেপ
কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ইরান যুদ্ধে অর্থায়নের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে। সিনেটে দলটির নেতা চাক শুমার বলেছেন, এই যুদ্ধ অবশ্যই থামাতে হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় বাজেটের নিয়ন্ত্রণ কংগ্রেসের হাতে। জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট যাতে নিজের সিদ্ধান্তে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্যই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রো খান্না একটি প্রস্তাব আনার কথা জানিয়েছেন। প্রস্তাবটি পাস হলে ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর আগে ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রেও কংগ্রেস অর্থায়ন বন্ধের পথ বেছে নিয়েছিল।
জন ফিহেরির মতে, সামরিক বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের ঋণসীমা বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্পকে এখন ডেমোক্র্যাটদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হবে। পাশাপাশি কংগ্রেসের শুনানিতে যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখে ফেলতে পারেন বিরোধী আইনপ্রণেতারা। তাঁদের মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি হতে পারে।
বিদায়ী রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস বলেছেন, হেগসেথকে এই যুদ্ধের বিষয়ে জবাব দিতে হবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসন ক্রো তাঁকে ‘অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে সমালোচনা করেছেন।
অধ্যাপক মাসগ্রেভের আশঙ্কা, আগামী দিনে সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক সংঘাত তৈরি হতে পারে প্রশাসনের ব্যয়সীমা ও কংগ্রেসের বাজেট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিয়ে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি কংগ্রেসের আরোপ করা বাজেটসংক্রান্ত বিধিনিষেধ মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের বাইরেও বড় ধরনের সাংবিধানিক বিরোধ দেখা দিতে পারে।
যুদ্ধের প্রস্তুতি কি থেমেছে
রাজনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি থেমে নেই। কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা চললেও পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের দিন মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পেন্টাগন হামলাটিকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বলে দাবি করেছে। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন রয়েছে। নতুন হামলার জন্য মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডও প্রস্তুত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানও সতর্ক করে জানিয়েছে, নতুন করে কোনো আগ্রাসন চালানো হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী জর্জিও ক্যাফিয়েরোর মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। কারণ, ২০২৭ সালের জানুয়ারির আগে ডেমোক্র্যাটরা আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারবে না। ফলে এই মধ্যবর্তী সময়ে তেহরানের ওপর আরও বড় সামরিক আঘাত হানার সুযোগ ট্রাম্পের সামনে থাকতে পারে।
তবে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান—দুই পক্ষই আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী। যদিও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জবাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছে ইরান।
ক্যাফিয়েরো সতর্ক করে বলেন, শান্তি আলোচনায় দুই পক্ষ বড় ধরনের ছাড় না দিলে দোহাভিত্তিক মধ্যস্থতা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁর আশঙ্কা, কাতার কোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করলেও ইসরায়েল তা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
তবে ভোটের রাতে ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর তাৎক্ষণিক কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। ফলে নির্বাচনী পরাজয়ের পর রিপাবলিকান নেতাদের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান কতটা প্রভাব ফেলবে, আর ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোবেন—তা এখনো অনিশ্চিত।