আট বছর পর নির্বাচন, জেন-জি আন্দোলনের প্রভাব
ভারতের ঐতিহ্যবাহী আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের (এএমইউ) ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন নাশরা নাঈম। বিশ্ববিদ্যালয়টির ১০৫ বছরের ছাত্র সংসদের ইতিহাসে প্রথম নারী সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। শুধু সহসভাপতি পদেই নয়, এবারের নির্বাচনে ছাত্র সংসদের মোট ১৩টি পদের মধ্যে ছয়টিতে জয় পেয়েছেন নারী প্রার্থীরা। এর মধ্যে ১০টি ক্যাবিনেট সদস্য পদের পাঁচটিতেই নারীদের জয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ আট বছর পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ দেখা যায়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ছাত্র সংসদের গণতান্ত্রিক কার্যক্রমে নতুন গতি ফিরেছে, অন্যদিকে নেতৃত্বের জায়গায় নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নতুন দৃষ্টান্ত।
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, সহসভাপতি পদে নাশরা নাঈম পেয়েছেন ৭ হাজার ৯১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৫ হাজার ৮১৮ ভোট। অর্থাৎ ১ হাজার ২৭৩ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন নাশরা। এই জয়কে কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য হিসেবে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের পুরুষপ্রধান ছাত্র নেতৃত্বের কাঠামোয় নারীদের অবস্থান সুদৃঢ় হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সভাপতি পদে ৪ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন মোহাম্মদ নোমান আশরাফ। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন মোহাম্মদ হামদান। এ ছাড়া ১০টি ক্যাবিনেট সদস্য পদের মধ্যে পাঁচটিতে নারী প্রার্থীদের জয় এবারের নির্বাচনে নারীদের শক্তিশালী উপস্থিতির বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয় কোর্ট নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অধ্যাপক জাভেদ তালিব এবং উইমেনস কলেজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অধ্যাপক নাজিয়া হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন।
আট বছর পর ভোট, আন্দোলনের পর ফিরল ছাত্র সংসদ
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে। এরপর প্রায় আট বছর ধরে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচন তাই কেবল নেতৃত্ব নির্বাচনের আয়োজন ছিল না; এটি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতিতে ফিরে আসারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের পর ভোটের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নির্বাচন আয়োজনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার দাবিতে শিক্ষার্থী নেতা ইয়াসির ফাহাদ ১৯ দিন অনশনও করেন। গত ৯ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। ৫ নভেম্বর ভোট গ্রহণের পর শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ফল প্রকাশ করা হয়।
নির্বাচনে প্রায় ৭৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। মোট ২০ হাজার ৭৫৪ জন ভোটারের মধ্যে ১৫ হাজার ৫২৩ জন তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। শিক্ষার্থীদের এই অংশগ্রহণ দীর্ঘ বিরতির পর ক্যাম্পাসের নির্বাচনী রাজনীতিতে আগ্রহ ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নাশরার জয় কেন গুরুত্বপূর্ণ
নাশরা নাঈমের জয়কে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি আইন বিভাগের বিএ-এলএলবি (বিএ ও আইন বিষয়ে সমন্বিত ডিগ্রি) কোর্সের শিক্ষার্থী। ছাত্র সংসদের সহসভাপতি পদে তাঁর জয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ তিনটি পদ—সভাপতি, সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের—একটিতে প্রথমবারের মতো কোনো নারীর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা।
নির্বাচনের আগে এক সাক্ষাৎকারে নাশরা বলেছিলেন, আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা তাঁদের সমস্যা বুঝবেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সেসব বিষয় তুলে ধরতে পারবেন।
ফল ঘোষণার পর নাশরা তাঁর সাফল্যকে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল হিসেবে বর্ণনা করেন। সীমিত সম্পদ ও ছোট একটি দল নিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সফল হওয়ার পেছনে সমর্থকদের নিষ্ঠা, সাহস ও আন্তরিকতার ভূমিকা ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে নেতৃত্বের ধরন নতুন করে ভাবা এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে আসে।
তবে এই জয়কে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ছাত্র সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁদের মতামত নীতিনির্ধারণে কতটা গুরুত্ব পায়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত হয় কি না এবং নেতৃত্বের অবস্থান থেকে তাঁরা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন—এসব বিষয়ও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
১৩টি পদের ছয়টিতে নারী, ক্যাবিনেটেও রেকর্ড
ছাত্র সংসদের ১৩টি পদের মধ্যে ছয়টিতে নারী প্রার্থীদের জয় এবারের নির্বাচনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সহসভাপতি পদে নাশরা নাঈমের পাশাপাশি ১০ সদস্যের ক্যাবিনেটে পাঁচজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হানিয়া খান, আরিবা দিলশাদ, শাজিয়া শামীম, আনিকা রুম্মান রাহি ও শাহিন পারভিন।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্টে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচনে ইউনানি চিকিৎসা অনুষদ থেকে আমিনা ফাইজান এবং বাণিজ্য অনুষদ থেকে ইলমা মাশরুফ নির্বাচিত হয়েছেন। এর ফলে ছাত্র সংসদের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোয় নারীদের উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেনস কলেজ স্টুডেন্টস ইউনিয়নের নির্বাচনেও নারী নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছে। সেখানে সভাপতি হয়েছেন আনাম রিয়াজ, সহসভাপতি আয়েশা খান এবং সাধারণ সম্পাদক মরিয়ম জান। ফলে মূল ছাত্র সংসদের নির্বাচন এবং নারী শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন—দুই ক্ষেত্রেই নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে।
ক্যাম্পাসের ইস্যু ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতি
এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছাড়াও জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় এসেছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আগের নির্বাচনে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিষয়গুলোই প্রচারণায় প্রাধান্য পেত। এবার জাতীয় বিভিন্ন ইস্যু, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে।
শিক্ষকের মতে, চলমান জেন-জি আন্দোলনের প্রভাবও নির্বাচনী পরিবেশে পড়েছে। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শিক্ষার্থীদের মতামত বা ভোটের সিদ্ধান্তে এসব ইস্যুর নির্দিষ্ট প্রভাব পরিমাপের কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে জাতীয় ইস্যুগুলো নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত আসায় নতুন নেতৃত্বের সামনে প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দীর্ঘদিন নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব না থাকায় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যা কতটা নিয়মিতভাবে প্রশাসনের কাছে পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। নতুন ছাত্র সংসদের দায়িত্ব হবে এসব দাবি সংগঠিতভাবে তুলে ধরা এবং প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে স্বাগত উপাচার্যের
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নাইমা খাতুন শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি নির্বাচনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের জয় হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ছাত্র সংসদে নারী শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বকে স্বাগত জানিয়ে নারী ক্ষমতায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণার সময় কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। দীর্ঘ বিরতির পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক দিক।
সভাপতি পদে মোহাম্মদ নোমান আশরাফ ৭ হাজার ৭৯৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাম্মদ ইনতিকাব পেয়েছেন ৩ হাজার ৬৭৬ ভোট। ফলে সভাপতি পদে জয়ের ব্যবধান ৪ হাজার ১২১ ভোট। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক বা সম্মানসূচক সম্পাদক পদে মোহাম্মদ হামদান পেয়েছেন ৮ হাজার ৩৮৫ ভোট।
নির্বাচনের ফলাফল একদিকে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর ছাত্র সংসদের পুনরুজ্জীবন, অন্যদিকে নারী নেতৃত্বের নতুন দৃষ্টান্ত সামনে এনেছে। তবে এই সাফল্যের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের দাবি কতটা কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চাকে কতটা নিয়মিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে পারেন, তার ওপর।
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাসে নাশরা নাঈমের সহসভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি পদে নারীর জয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব, নারী নেতৃত্ব এবং দীর্ঘ বিরতির পর ক্যাম্পাসের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।