টিভি পর্দা আর কোর্টের বড় পর্দায় তখন ভেসে উঠেছে ‘ম্যাচ পয়েন্ট’। আলেক্সান্ডার স্ফেরেফের সার্ভিস রিটার্ন বাইরে মেরে দিলেন বেন শেল্টন। গ্যালারিজুড়ে উল্লাস। আম্পায়ারের কণ্ঠে ভেসে এল, ‘গেম, সেট অ্যান্ড ম্যাচ স্ফেরেফ।’ কিন্তু স্ফেরেফের কোনো ভাবান্তর নেই। তিনি তখনও পরের পয়েন্টের জন্য বেজলাইনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ধারাভাষ্যকার হাসতে হাসতে বললেন, স্ফেরেফ যেন জানেনই না ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে!
সত্যিই তাই। খেলার মধ্যে এতটাই ডুবে ছিলেন জার্মান তারকা যে, চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মুহূর্তে বুঝতেই পারেননি। গ্যালারির উল্লাসে একপর্যায়ে তাঁর সম্বিত ফেরে। বড় পর্দায় নিজের মুখ দেখে ফুটে ওঠে চওড়া হাসি। এরপর দুই হাত উঁচিয়ে ছুটে যান উদ্যাপনে।
ছয় বছর আগের সেই তেতো অভিজ্ঞতার কথা মনে রেখেই হয়তো এবার এতটা নিবিষ্ট ছিলেন স্ফেরেফ। এই আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামেই ২০২০ সালের ইউএস ওপেন ফাইনালে দুই সেটে এগিয়ে গিয়েও ডমিনিক থিয়েমের কাছে হেরে গিয়েছিলেন তিনি। সেই দুঃস্বপ্নের অধ্যায়কে পেছনে ফেলে এবার একই কোর্টে স্বপ্ন পূরণ করলেন ২৯ বছর বয়সী জার্মান তারকা।
ইউএস ওপেনের ফাইনালে শেল্টনকে ৬-৩, ৭-৬ (৭-২), ৫-৭, ৬-২ গেমে হারিয়ে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা জিতেছেন স্ফেরেফ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম—গত জুনে ফরাসি ওপেন জয়ের পর এবার তাঁর হাতে উঠল ইউএস ওপেনের ট্রফি। পেশাদার ক্যারিয়ারের প্রথম এক যুগে গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপার দেখা পাননি স্ফেরেফ। ২০২০ সালে ইউএস ওপেনের ফাইনালে হারের পর গত বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালেও হারতে হয়েছিল তাঁকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার যেন সব হিসাব একসঙ্গে মিটিয়ে দিলেন তিনি।
এবারের ইউএস ওপেন ছিল তাঁর ১১তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল। আর এই শিরোপা তাঁকে এনে দিয়েছে গ্র্যান্ড স্ল্যাম ইতিহাসের রেকর্ড ৫৫ লাখ মার্কিন ডলারের পুরস্কার। নারী এককের চ্যাম্পিয়ন এলেনা রিবাকিনাও পেয়েছেন একই অঙ্কের অর্থ।
শিরোপা জয়ের পর স্ফেরেফ বললেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিশ্রম ও হতাশা সহ্য করার ফলই এখন পাচ্ছেন তিনি, ‘আমি মনে করি, ঈশ্বর দেখেছেন আমরা কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছি, কতটা কষ্ট সহ্য করেছি, কতটা যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। আমার মনে হয়, ২০২৬ সাল হলো আগের সব বছরের ফলাফল।’ নিজের স্বপ্ন পূরণ করলেও স্ফেরেফকে লড়তে হয়েছে পুরো গ্যালারির বিপক্ষে। কারণ প্রতিপক্ষ ছিলেন স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ বছর বয়সী বেন শেল্টন। নিউইয়র্কের দর্শকেরা শুরু থেকেই শেল্টনের পক্ষে ছিলেন। সেই চাপ সামলে খেলেছেন স্ফেরেফ।
ম্যাচ শেষে তাই স্বাগতিক দর্শকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি. ‘আমি জানি, আজ ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষই চেয়েছিল বেন জিতুক। এজন্য আমি খুবই দুঃখিত। যদিও জানি দর্শকেরা আমার বিপক্ষে ছিল, তারা সবসময়ই অবিশ্বাস্য রকম ন্যায্য ছিল এবং খেলোয়াড় হিসেবে আমরা এর প্রশংসা করি।’
শেল্টনের এটি ছিল প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল। তাঁর শক্তিশালী সার্ভ ও আক্রমণাত্মক টেনিসের কারণে ফাইনালে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রত্যাশাই ছিল বেশি। কিন্তু শুরু থেকেই স্ফেরেফের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় ম্যাচ। প্রথম সেটে শেল্টনের সার্ভিস ভাঙার পর স্ফেরেফ আর তাঁকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেননি। দ্বিতীয় সেটেও শেল্টন লড়াইয়ে থাকার চেষ্টা করেন। স্থানীয় দর্শকেরা প্রতিটি পয়েন্টে তাঁকে উজ্জীবিত করতে থাকেন। স্ফেরেফের একটি ডাবল ফল্টে গ্যালারিতে উল্লাসও ছড়িয়ে পড়ে। তবে টাইব্রেকারে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ান জার্মান তারকা। একপর্যায়ে ৫-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় সেটও নিজের করে নেন তিনি।
তৃতীয় সেটে মনে হচ্ছিল, সোজা সেটেই ফাইনাল শেষ করে দেবেন স্ফেরেফ। কিন্তু শেল্টন হাল ছাড়েননি। একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রেক পয়েন্টে দুর্দান্ত ব্যাকহ্যান্ড উইনার মেরে স্ফেরেফ বিপদ সামলালেও পরে শেল্টন ম্যাচে ফেরার পথ তৈরি করেন। কোর্টে পিছলে পড়ে যাওয়ার পর হতাশা প্রকাশ করেও দ্রুত নিজেকে সামলে নেন শেল্টন। এরপর বেজলাইন থেকে একের পর এক শক্তিশালী গ্রাউন্ডস্ট্রোকে স্ফেরেফকে চাপে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত সার্ভিস ব্রেক করে তৃতীয় সেট জিতে ম্যাচ চতুর্থ সেটে নিয়ে যান। কিন্তু স্ফেরেফকে থামানোর জন্য সেটিই যথেষ্ট ছিল না।
চতুর্থ সেটের শুরুতেই ২৫ শটের দীর্ঘ র্যালির পর শেল্টনের সার্ভিস ভেঙে দেন স্ফেরেফ। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। নিজের সার্ভ ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত ৬-২ গেমে সেট জিতে নিশ্চিত করেন বহু প্রতীক্ষিত ইউএস ওপেন শিরোপা।
আরথার অ্যাশ স্টেডিয়ামে শেল্টনের হার শুধু একটি ফাইনালে পরাজয় নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ টেনিসের দীর্ঘ অপেক্ষাও আরও বাড়িয়ে দিল। ২০০৩ সালে অ্যান্ডি রডিকের পর ইউএস ওপেন পুরুষ এককে আর কোনো আমেরিকান খেলোয়াড় চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। আরথার অ্যাশের পর ৫৪ বছর পর নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনালে ওঠা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান পুরুষ খেলোয়াড়ও ছিলেন শেল্টন। ফলে তাঁর ওপর প্রত্যাশার চাপ ছিল আরও বেশি। তাঁর বান্ধবী ও যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল তারকা ট্রিনিটি রডম্যানও প্রায় ২০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্লেয়ার্স বক্সে পৌঁছেছিলেন। দুজনের খেলার সময় প্রায় একই হওয়ায় শেল্টনের ম্যাচের পুরোটা দেখা তাঁর হয়ে ওঠেনি।
হারের পরও শেল্টন ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেছেন, তিনি বলেন, ‘আমার সাফল্যগুলো যেমন উপহার, ব্যর্থতাগুলোও তেমনি উপহার। আপনাদের সামনে এখানে খেলতে পারাটাও বড় উপহার।’
স্ফেরেফের এই শিরোপা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে গত কয়েক বছরের প্রেক্ষাপটে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইয়ানিক সিনার ও কার্লোস আলকারাস মিলেই পুরুষ এককের সব গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছিলেন। চলতি বছরও প্রথম দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম তাঁদের দখলে যায়। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতেন আলকারাস। দীর্ঘ চোট কাটিয়ে ইউএস ওপেনে ফিরলেও কোয়ার্টার ফাইনালে শেল্টনের কাছে হেরে যান তিনি। অন্যদিকে উইম্বলডনজয়ী সিনার চোটের কারণে ইউএস ওপেন থেকে সরে দাঁড়ান।
ফলে স্ফেরেফের পথ কিছুটা সহজ হয়েছিল—এ কথা তিনিও স্বীকার করছেন।
শিরোপা জয়ের পর তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এখন নিজেকে বিশ্বের এক নম্বর মনে করেন কি না। স্ফেরেফের উত্তর ছিল বেশ বাস্তবসম্মত। তিনি বলেন, ‘সিনার চোটের কারণে বাইরে থাকায় এবং আলকারাস চার মাস পর চোট থেকে ফিরে আসায়, এই মুহূর্তে হয়তো হ্যাঁ। তবে তারা দুজনেই যদি সুস্থ থাকত এবং সেরা ফর্মে থাকত, তাহলে হয়তো আমি এক নম্বর নই।’ এরপর আরও সরাসরি বলেন, ‘যদি সবাই সুস্থ থাকে, আমার মনে হয় ইয়ানিক এখনও এগিয়ে থাকবে। ব্যাপারটা এরকমই সাধারণ।’
তবু এবার স্ফেরেফের সামনে আর কোনো অজুহাত নেই। ১২ বছরের অপেক্ষা, দুটি হেরে যাওয়া গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল, ধারাবাহিক হতাশা—সবকিছুকে পেছনে ফেলে তিনি এখন দুই গ্র্যান্ড স্ল্যামের মালিক। যে কোর্ট একসময় তাঁকে দুঃস্বপ্ন উপহার দিয়েছিল, ছয় বছর পর সেই কোর্টেই তিনি লিখলেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।