উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলে হেরে এশিয়ান গেমস শুরু বাংলাদেশের
এশিয়ান গেমসে নারী ফুটবলে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ। লক্ষ্য ছিল প্রতিপক্ষের শক্তি নিয়ে না ভেবে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার। কিন্তু ম্যাচের শুরুতেই গোল হজম করার পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি মারিয়া মান্দা, শিউলি আজিমদের দল। একের পর এক আক্রমণে দিশেহারা বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার কাছে হেরেছে ১০-০ গোলে।
সোমবার জাপানের ওসাকার নাগাই স্টেডিয়ামে এই হারে এশিয়ান গেমসের নারী ফুটবল ‘এফ’ গ্রুপের অভিযান শুরু করল বাংলাদেশ। তিনবারের এশিয়ান গেমস চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে শুরু থেকেই একতরফা ছিল ম্যাচের চিত্র। বাংলাদেশের জন্য পরাজয়টি শুধু বড় ব্যবধানের হারই নয়, এটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হারও। এর আগে ২০১৩ সালে এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে থাইল্যান্ডের কাছে ৯-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। এবার সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেল উত্তর কোরিয়া।
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের রক্ষণে চাপ তৈরি করে উত্তর কোরিয়া। মাত্র পাঁচ মিনিটেই জন রয়োং জংয়ের গোলে এগিয়ে যায় তারা। গোলের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দশম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন সেই জং। এরপর বাংলাদেশকে কার্যত নিজেদের অর্ধেই আটকে রাখে উত্তর কোরিয়া। বক্সের বাইরে বল নিয়ে আক্রমণে যাওয়ার সুযোগ খুব কমই পেয়েছে মারিয়ারা। একই সঙ্গে রক্ষণভাগেও তৈরি হয়েছে একের পর এক ফাঁক। প্রথমার্ধেই আরও পাঁচ গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় উত্তর কোরিয়া। বিরতির আগেই ৭-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের ধার কমেনি। ৫১ মিনিটে রাই সং এবং ৬০ মিনিটে জং জুম গোল করলে ব্যবধান আরও বাড়ে। বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তার এরপর কয়েকটি ভালো সেভ করে দলকে আরও বড় বিপর্যয় থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা করেন। ৮৫ মিনিটে কুম জংয়ের প্রচেষ্টা এবং কিছুক্ষণ পর হান জিন হংয়ের শটও সামলে দেন তিনি। তবে ম্যাচের শেষদিকে আর রক্ষা হয়নি। হান জিন হংয়ের কোনাকুণি শট পা দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন মিলি। সেই গোলেই উত্তর কোরিয়ার ব্যবধান পৌঁছে যায় ১০-০-তে। বাংলাদেশের জন্য নিশ্চিত হয় নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের হার।
উত্তর কোরিয়ার এই লাগাতার আক্রমণের বিপরীতে বাংলাদেশ তাদের গোলমুখে একটি শটও নিতে পারেনি।
আজ অভিজ্ঞদের বাইরে রেখে কিছুটা তারুণ্যনির্ভর একাদশ সাজিয়েছিলেন কোচ পিটার বাটলার। ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মুনকি আক্তার, শামসুন্নাহার ছিলেন বেঞ্চে। জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হয় ডিফেন্ডার অর্পিতা বিশ্বাসের। গোলপোস্টের দায়িত্ব পান মিলি আক্তার। তবে ম্যাচের ২৩ মিনিটেই অর্পিতাকে তুলে শিউলি আজিমকে মাঠে নামাতে হয়। এরপর ৬৯ মিনিটে আনিকাকে তুলে ডিফেন্ডার শামসুন্নাহারকে নামান বাটলার। গোলের পর গোল হজম করলেও ম্যাচে বাংলাদেশের পরিবর্তন ছিল এ দুটিই। অভিজ্ঞদের নিয়ে একাদশ সাজালে ফলটা অন্য রকম হতো কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কারণ দুই দলের শক্তির পার্থক্যটা যে আকাশ-পাতাল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে উত্তর কোরিয়া ১১ নম্বরে, বাংলাদেশ ১০৭। ব্যবধান ৯৬ ধাপ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সাফল্যেও দুই দলের মধ্যে বিশাল ফারাক।

বাংলাদেশ নারী দলের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প এখন পর্যন্ত দুটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা। এশিয়ান গেমসে এর আগে অংশগ্রহণ মাত্র একবার, ২০২২ আসরে। সে বার গ্রুপ পর্বে একটি ম্যাচ ড্র করে বিদায় নিতে হয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাঁচবার বিশ্বকাপে খেলা দলটি তিনবার এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন। অলিম্পিকে খেলেছে দুবার। আর এশিয়ান গেমসে ছয়বার সোনার লড়াইয়ে নেমে তিনবারই জয় আছে। তারপরও আজকের হারটা বাংলাদেশের জন্য বেশ বড় ধাক্কা। গত মার্চে এএফসি এশিয়ান কাপে এই উত্তর কোরিয়ার কাছেই বাংলাদেশ হেরেছিল ৫-০ গোলে। এবার ব্যবধান দ্বিগুণ।
বড় ব্যবধানে হারের হতাশা নিয়েই এখন পরের ম্যাচের প্রস্তুতি নিতে হবে বাংলাদেশকে। ‘এফ’ গ্রুপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার মুখোমুখি হবে মারিয়ারা। উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং বল দখল ধরে রাখতে না পারার যে সমস্যা দেখা গেছে, পরের ম্যাচে তা কাটিয়ে ওঠাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শক্তিশালী দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষেও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য।
এশিয়ান গেমস শেষ নবীরণের
৭ সেপ্টেম্বর চায়নিজ উইমেন্স সুপার লিগের দল গুয়াংডং এফসির বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে হাঁটুতে গুরুতর চোট পান নবীরণ খাতুন। চোটের কারণে তাঁকে আর এশিয়ান গেমসে পাওয়া যাচ্ছে না। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেলেছেন নবীরণ। এরপর জাতীয় দলে জায়গা করে নেন তিনি। গত বছরের মার্চে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হয় এই সেন্টারব্যাকের। ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও হয়ে ওঠেন নবীরণ। তাঁর চোটে রক্ষণভাগ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কোচ পিটার বাটলারকে। দলে থাকা অন্য চার সেন্টারব্যাক হলেন শিউলি আজিম, আফঈদা খন্দকার, কোহাতি কিসকু ও অর্পিতা বিশ্বাস।