বটবাহিনীর গ্রাসে ডিজিটাল বাংলাদেশ: সমাজ ও রাষ্ট্রের নতুন চ্যালেঞ্জ

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবন, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক যোগাযোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মগুলোর উন্মুক্ত পরিবেশের সুযোগ নিয়ে একটি নতুন ধরনের অদৃশ্য শক্তি ক্রমেই প্রভাব বিস্তার করছে—‘বটবাহিনী’।

অনেকের কাছে অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতাই দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এসব দৃশ্যমান সংকটের আড়ালে আরেকটি নীরব হুমকি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। সেটি হলো কৃত্রিমভাবে পরিচালিত অনলাইন প্রচারণা, ভুয়া অ্যাকাউন্ট এবং সমন্বিত ডিজিটাল অপপ্রচার।

সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট একটি অনুষ্ঠানে সরকারের একজন শীর্ষ প্রযুক্তি উপদেষ্টা মন্তব্য করেন যে, দেশের সাইবার জগতের উল্লেখযোগ্য অংশের ট্রাফিক স্বয়ংক্রিয় বা কৃত্রিম কার্যকলাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যদিও এ ধরনের পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন, তবুও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমান সব প্রতিক্রিয়া প্রকৃত ব্যবহারকারীদের নয়।

বট কী?

‘বট’ (Bot) শব্দটি এসেছে ‘রোবট’ থেকে। এটি এমন একটি সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট, মন্তব্য, লাইক, শেয়ার বা বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে। হাজার হাজার এমন ভুয়া বা স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্টকে একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে সেটিকে সাধারণভাবে ‘বট আর্মি’ বা ‘বটবাহিনী’ বলা হয়।

এ ধরনের নেটওয়ার্ক সাধারণত দুটি রূপে দেখা যায়। প্রথমটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারনির্ভর বট, যা নির্দিষ্ট কী-ওয়ার্ড বা নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে। দ্বিতীয়টি হলো ‘হিউম্যান ট্রল নেটওয়ার্ক’, যেখানে বাস্তব মানুষ একাধিক ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে সমন্বিতভাবে প্রচারণা চালায়।

কীভাবে কাজ করে?

বটবাহিনীর প্রধান উদ্দেশ্য হলো জনমতকে প্রভাবিত করা। কোনো ঘটনা ঘটার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শত শত অভিন্ন মন্তব্য, একই ধরনের প্রচারণা কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংগঠিত আক্রমণ শুরু হতে পারে।

এ ছাড়া সমন্বিতভাবে রিপোর্ট করে কোনো পেজ বা অ্যাকাউন্ট বন্ধের চেষ্টা, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে চরিত্রহনন এবং কৃত্রিম জনপ্রিয়তা তৈরি করাও এ ধরনের নেটওয়ার্কের পরিচিত কৌশল।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তির কারণে এসব বট আরও উন্নত হয়েছে। তারা শুধু একই মন্তব্য কপি-পেস্ট করে না; বরং মানুষের মতো ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতেও সক্ষম।

কেন এটি উদ্বেগের?

গণতন্ত্র, মুক্ত মতপ্রকাশ এবং সুস্থ জনপরিসরের জন্য তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কৃত্রিম উপায়ে কোনো মতামতকে জনমতের রূপ দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারেন।

মনোবিজ্ঞানে এটিকে ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ বলা হয়—যেখানে মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠের মত বলে মনে হওয়া কোনো অবস্থানকে সহজেই গ্রহণ করতে শুরু করে। রাজনৈতিক যোগাযোগে একই ধরনের কৌশলকে ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ বলা হয়, যেখানে কৃত্রিমভাবে জনসমর্থনের আবহ তৈরি করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচন, জনস্বাস্থ্য, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং সামাজিক ইস্যুতে সমন্বিত অনলাইন অপপ্রচার ও বট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ঘটনা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু প্রযুক্তিগত নয়; বরং গণতন্ত্র, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বট শনাক্তের কিছু সাধারণ লক্ষণ

* পোস্ট প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অস্বাভাবিক সংখ্যক মন্তব্য।
* অসংখ্য অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় একই ভাষার মন্তব্য।
* প্রোফাইলে ব্যক্তিগত তথ্য বা স্বাভাবিক কার্যক্রমের অভাব।
* কেবল রাজনৈতিক বা বিতর্কিত বিষয়েই সক্রিয় থাকা।
* একই ধরনের ছবি, নাম বা আচরণগত মিল।

তবে মনে রাখতে হবে, এসব বৈশিষ্ট্য থাকলেই কোনো অ্যাকাউন্টকে নিশ্চিতভাবে বট বলা যায় না। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।

 

কী করা প্রয়োজন?

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয় জরুরি।

প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলা ভাষা ও স্থানীয় প্রেক্ষাপট বোঝার সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সংঘবদ্ধ ভুয়া তথ্য প্রচার, সমন্বিত ডিজিটাল প্রতারণা এবং ক্ষতিকর বট নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও প্রতিরোধে স্বচ্ছ ও মানবাধিকারসম্মত আইনি কাঠামো প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণের শিক্ষা জোরদার করতে হবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তির বিস্তার নয়; বরং এমন একটি নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে প্রকৃত মানুষের কণ্ঠস্বর কৃত্রিম প্রচারণার ভিড়ে হারিয়ে যাবে না। রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক—সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে।
 

বিষয়:

বট বটবাহিনী
এলাকার খবর

সম্পর্কিত