ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের লংমার্চকে দেশের চলমান গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মানুষের গণআকাঙ্ক্ষার ‘পরিপন্থী’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তাঁর অভিযোগ, সংসদীয় বিতর্ককে দ্রুত রাজপথে নিয়ে গিয়ে লংমার্চের মতো কর্মসূচি দেওয়ার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
শনিবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউট (বিলিয়া) মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের পর্যালোচনা: সুশাসন, জবাবদিহিতা ও উন্নয়নের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে সিটিজেন ফোরাম বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ইনিশিয়েটিভস (বিসিএআই)।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জাতীয় সংসদ যখন কার্যকরভাবে চলছে, তখন সংসদীয় বিতর্ককে রাজপথে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক নয়। তাঁর ভাষায়, ‘জাতীয় সংসদ যখন সন্তোষজনকভাবে কার্যকর রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে আন্দোলনের নামে রাজপথে লংমার্চ করার মতো কর্মসূচি সাধারণ মানুষের গণআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।’
১১ দলীয় জোটের লংমার্চকে ঘিরে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো কী বিবেচনায় এ ধরনের কর্মসূচি নিচ্ছে, তা তিনি জানেন না। তবে এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ‘অপশক্তি’ অপেক্ষা করে থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জহির উদ্দিন স্বপনের এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগেই ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে লংমার্চ শুরু করে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ ছয় দফা দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করছে জোটটি।
শনিবার সকাল সাতটার দিকে শাপলা চত্বরে সমাবেশের পর সোয়া আটটার দিকে গাড়িবহর চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। পথে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড ও কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডসহ বিভিন্ন স্থানে পথসভা করার কর্মসূচি রয়েছে। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জনসভার মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ করার কথা রয়েছে।
লংমার্চ নিয়ে সরকারের সমালোচনার জবাবে ১১ দলীয় জোটের নেতারা অবশ্য এটিকে সরকার পতনের কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের কুমিল্লার এক পথসভায় বলেন, এ লংমার্চ সরকারের পদত্যাগ বা সরকার পতনের আন্দোলন নয়; এটি সরকারের জন্য ‘ওয়েক-আপ কল’।
তিনি বলেন, জনগণের চাহিদা ও দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরাই এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য। আন্দোলনের পর সরকার সমস্যাগুলো উপলব্ধি করে যৌক্তিক পরিকল্পনা নেবে—এমন প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
অন্যদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম নেতা ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম লংমার্চে বাধা দেওয়া হলে আন্দোলনের ধরন বদলে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হবে। তবে সরকার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ছয় দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে।
লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, এটি শুধু ১১ দলের কর্মসূচি নয়; সাধারণ মানুষের কর্মসূচি। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট এবং বিভিন্ন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এ কর্মসূচি বলে দাবি করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও শনিবার নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডে এক পথসভায় সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার সবকিছু এখনো পূরণ হয়নি। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সুশাসনসহ মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
শফিকুর রহমানের অভিযোগ, ‘এই সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না।’ তাঁর বক্তব্য, ১১ দলীয় ঐক্য জনগণের পাশে রয়েছে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়েও গোলটেবিল বৈঠকে কথা বলেন জহির উদ্দিন স্বপন। তাঁর দাবি, গত দুই দশকের ‘ফ্যাসিবাদের চর্চা’, ভঙ্গুর সামাজিক ব্যবস্থা এবং দুর্বল অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে দেশকে বের করে আনার জন্য বর্তমান সরকার একটি নতুন গতিমুখ নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি বলেন, সংকট এত গভীর ছিল যে রাতারাতি কোনো ‘জাদুকরী পরিবর্তন’ সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার ইতিমধ্যে নীতিগত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
জ্বালানি সংকটের জন্য আগের সরকারের নীতির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর নীতির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংকটে পড়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না নেওয়াকে তিনি ‘জাতির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতারণা’ বলে মন্তব্য করেন।
তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার শুধু সংকটের কথা বলে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে না; বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা এবং দেশের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চীন ও ভারতের বাইরে পণ্য আমদানির নতুন উৎস তৈরি, আমদানি ব্যয় কমানো এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপরও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সংসদে বিতর্ক ও ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’-এর মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার সুযোগ রয়েছে। তাই সংসদের বিতর্ককে দ্রুত রাজপথের আন্দোলনে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য বাধা তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, সরকারি দলকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা বিরোধী দলের দায়িত্ব।
গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। সাখাওয়াত হোসেনের সঞ্চালনায় এতে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান, মানবাধিকারকর্মী শিরিন হকসহ রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরা বক্তব্য দেন।
একদিকে সরকারপক্ষ সংসদকে কার্যকর রেখে রাজনৈতিক বিতর্ক সংসদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখার ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী জোট রাজপথে নিজেদের দাবির পক্ষে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চকে ঘিরে সরকারের সঙ্গে বিরোধী জোটের রাজনৈতিক দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চট্টগ্রামের সমাপনী সমাবেশ থেকে জোটের পরবর্তী কর্মসূচি ও রাজনৈতিক অবস্থান কী হয়, সেটিই এখন নজরে।