নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ১০ দিন পরও মিলছে বেঁচে থাকার খবর। শনিবার আলাদা দুটি উদ্ধার অভিযানে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ থেকে চীনের এক শ্রমিক এবং ধসে পড়া একটি বাড়ির নিচ থেকে এক নেপালি নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগের দিন একই অঞ্চলের আরেকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দুই নেপালি শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। ফলে কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ থাকা মানুষদের মধ্যে আরও জীবিত কাউকে পাওয়ার আশা জোরালো হয়েছে।
তবে সেই আশার পাশাপাশি শনিবার একটি হতাশাজনক খবরও এসেছে। শুক্রবার দুই শ্রমিককে উদ্ধারের পর ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের যে সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান চলছিল, সেটির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তল্লাশি করে আর কাউকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের ভেতরের বড় অংশ কাদা, মাটি ও পাথরে পুরোপুরি চাপা পড়ে গেছে। ফলে ওই সুড়ঙ্গে আর কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন তাঁরা।
২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সূত্রপাত হয়। বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল ঢল ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় নেমে এসে বহু জনপদ, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস করে দেয়। দুর্যোগের পর নেপালে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ বলে বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক সূত্রের সর্বশেষ হিসাবে জানা যাচ্ছে।
শনিবার যে চীনা শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁর নাম লুহাইতাও। নেপালি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তিনি রাসুয়া জেলার আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ২২৫ মিটার দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গে আটকা ছিলেন। উদ্ধারকারীরা তাঁকে কাদা ও ধ্বংসাবশেষে আটকে থাকা অবস্থায় বের করে আনেন। পরে সামরিক চিকিৎসকেরা তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং হেলিকপ্টারে করে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এর এক দিন আগে, শুক্রবার, ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে ৩০ বছর বয়সী যন্ত্রকৌশল বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ এবং ৪৫ বছর বয়সী সুপারভাইজার কবীর মহারাজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাঁরা সুড়ঙ্গের প্রায় ১৭০ মিটার ভেতরে আটকা ছিলেন। ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সরু একটি পথ তৈরি করে তাঁদের কাছে পৌঁছান উদ্ধারকারীরা। দুজনকেই চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে।
এই উদ্ধার অভিযানে নেপালি সেনা ও পুলিশের পাশাপাশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও কাজ করছেন। ধসে যাওয়া সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ পর্যন্ত পৌঁছানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও প্রায় ১৭০ মিটার পর্যন্ত কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমে ছিল। পুরোনো নকশা, স্যাটেলাইট ছবি ও প্রকল্পের অবকাঠামোর তথ্য ব্যবহার করে উদ্ধারকারীরা সম্ভাব্য প্রবেশপথ চিহ্নিত করেন। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে ধাপে ধাপে মাটি ও পাথর সরানো হয়।
শুক্রবার দুই শ্রমিককে উদ্ধারের পর সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে আরও মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। এতে নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু পরে উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে তল্লাশি চালিয়ে জানান, সেখানে আর কাউকে পাওয়া যায়নি। পানির প্রবল চাপ ও কাদার কারণে সুড়ঙ্গের বিভিন্ন অংশের কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু জায়গা এতটাই ধ্বংসাবশেষে ভরা যে সেখানে প্রবেশ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের জলবিদ্যুৎ খাত এই দুর্যোগে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৯০০ শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বিভিন্ন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শনিবার নুয়াকোট এলাকায় ধসে পড়া একটি বাড়ির নিচ থেকেও ৬৪ বছর বয়সী চান্দিকা শ্রেষ্ঠকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। প্রায় ১০ দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকার পর উদ্ধার করা ওই নারীকে চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডু নেওয়া হয়েছে। তাঁর উদ্ধারের ঘটনাও নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।
তবে উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াইটিও আরও কঠিন হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা মানুষের খাবার, পানি, অক্সিজেন ও শারীরিক সক্ষমতা—সবই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় রাস্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম ঘটনাস্থলে পৌঁছানোও কঠিন।
নেপাল সরকারের উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য আলাদা অনলাইন পোর্টালও চালু রয়েছে। সেখানে নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি উদ্ধার-সহায়তার আবেদন এবং সরকারি তৎপরতার তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।
এই দুর্যোগে নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপরও বড় ধাক্কা এসেছে। জলবিদ্যুৎনির্ভর দেশটির একাধিক প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো পুনর্গঠন নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলন, অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতের অবকাঠামো নির্মাণে দুর্যোগঝুঁকি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
এদিকে উদ্ধার অভিযানে একের পর এক জীবিত মানুষ উদ্ধারের ঘটনা স্বজনদের আশা জাগালেও হাজারো নিখোঁজ মানুষের পরিণতি এখনো অজানা। তাই ধ্বংসস্তূপ, নদী উপত্যকা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলোতে তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে নেপালি নিরাপত্তা বাহিনী ও উদ্ধারকারী দল।