নভেম্বরের শেষভাগে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে শুরু হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। প্রথম ধাপে দেশের নির্বাচনযোগ্য ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ভোট নেওয়ার পর ছয় বা সাত ধাপে পর্যায়ক্রমে বাকি ইউনিয়নগুলোর নির্বাচন শেষ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসি সূত্র বলছে, ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বরের শেষদিকে প্রথম ধাপের ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করছে কমিশন। নির্বাচন উপযোগী সব ইউনিয়নের ভোট আগামী বছরের শেষ নাগাদ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ইসি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও প্রস্তুতি নিতে ইসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত ২ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠি পাওয়ার পরই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি জোরদার করে ইসি।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য কমিশনের সব প্রস্তুতি রয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তফসিল এবং নভেম্বরে ভোট শুরুর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এগোনো হচ্ছে। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ চলছে। ইউপি নির্বাচন কয় ধাপে হবে—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, আগের নির্বাচনগুলোর মতো মোটামুটি একই পদ্ধতিতে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোনো ইউনিয়নে মামলা, সীমানা নির্ধারণ বা অন্য কোনো আইনি জটিলতা থাকলে সেখানে আপাতত নির্বাচন হবে না।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকারও ছয় বা সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ একসঙ্গে পুরো দেশের ইউনিয়ন পরিষদে ভোট না নিয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে কমিশন।
দেশে বর্তমানে মোট ইউনিয়ন পরিষদ ৪ হাজার ৫৮১টি। এর মধ্যে ২০২১ ও ২০২২ সালে নির্বাচন হওয়া ৩ হাজার ৯৮১টি ইউনিয়ন চলতি বছর নির্বাচনযোগ্য হচ্ছে। এসব ইউনিয়নের নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করা হবে। অন্য ইউনিয়নগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচনযোগ্য হবে।
আইন অনুযায়ী, কোনো ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১৮০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। ফলে নির্বাচনযোগ্য ইউনিয়নগুলোতে সময়মতো ভোট আয়োজনের চাপও রয়েছে কমিশনের ওপর।
আগের নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় প্রথম ধাপে কোন কোন ইউনিয়নে ভোট হবে, তা নিয়েও কমিশনে আলোচনা চলছে। ২০২১ সালের প্রথম ধাপের নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের চার জেলা ছাড়াও রংপুর, বগুড়া, খুলনা ও বাগেরহাটের ৩৬৭টি ইউনিয়নে ভোট হয়েছিল। এবারও ওই এলাকার নির্বাচনযোগ্য ইউনিয়নগুলোকে প্রথম ধাপের তফসিলে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে কমিশন।
আইন ও আচরণবিধি চূড়ান্তের পথে
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আইন ও বিধিমালা সংস্কারের কাজও শেষ পর্যায়ে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইন এবং স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। ভেটিং শেষে অনুমোদিত বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। ভোটার তালিকার প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। ইসির হিসাবে দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। ভোটার স্থানান্তরের আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ৭ সেপ্টেম্বর এবং তা নিষ্পত্তির সময় ১০ সেপ্টেম্বর। এরপর ভোটার তালিকা মুদ্রণের জন্য পাঠানো হবে।
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকাও প্রস্তুত করেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ৪২ হাজার ৭৬১টি কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একসঙ্গে দুটি ভোট না থাকায় কেন্দ্রের সংখ্যা আরও দুই থেকে তিন হাজার বাড়তে পারে বলে মনে করছে ইসি। গড়ে প্রতি দুই হাজার ভোটারের জন্য একটি ভোটকেন্দ্র রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে আগাম প্রস্তুতি
স্থানীয় নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। নভেম্বরের আগে অথবা যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। কারণ, দেশের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র হিসেবে বিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষকদের বড় অংশকে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে নির্বাচনকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা থাকলে ভোটের প্রস্তুতিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলায় সেনা নয়
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রস্তুতি শুরু করেছে কমিশন। পুলিশ, বিজিবি এবং আনসার ও ভিডিপির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন পুলিশপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর একটি প্রতিবেদন চেয়েছেন। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্থানীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই কমিশনের। পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনী দিয়েই ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচনী সামগ্রীও প্রস্তুত
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আগেই বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ করে রেখেছিল কমিশন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেগুলোর বড় একটি অংশ ব্যবহার করা হবে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীও আগাম কেনা হয়েছিল, যাতে সংসদ নির্বাচনের পর দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করা যায়।
ইসি সূত্র জানায়, ছোট হোসিয়ান ব্যাগ ও গানিব্যাগ ১ লাখ ১৫ হাজার করে, বড় হোসিয়ান ব্যাগ ৭৫ হাজার, মার্কিং সিল ১৭ লাখ ৫০ হাজার এবং অফিসিয়াল সিল ৮ লাখ ৪০ হাজারসহ বিভিন্ন নির্বাচনী সামগ্রী মজুত রয়েছে। এসব সামগ্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদও জানিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে কমিশনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। যে কোনো সময় ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। ফলে দীর্ঘ বিরতির পর দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনের তোড়জোড় এখন দৃশ্যমান। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট দিয়ে শুরু হবে এই প্রক্রিয়া। এরপর পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ভোট আয়োজন করবে কমিশন। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাসে স্থানীয় পর্যায়ে আবারও নির্বাচনী ব্যস্ততা বাড়তে যাচ্ছে।