রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে। একসময় চুরি-ছিনতাই বা ছোটখাটো অপরাধের অভিযোগ বেশি শোনা গেলেও এখন সংঘবদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য, মাদক কারবার, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, মানবপাচার ও অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ক্যাম্পের ভেতরে আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি এসব অপরাধের কিছু অংশ ক্যাম্পের বাইরের এলাকা ও সীমান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত নয় বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধে সাড়ে চার হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, ধর্ষণ ও মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধ রয়েছে।
অপহরণ এখন ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকার মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগ। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত অপহরণের ৩০৬টি মামলায় ৩৫৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। মানবপাচারের চার শতাধিক মামলায় আসামি করা হয়েছে ৮৭৯ জনকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় দালালদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা চক্র এসব অপরাধে জড়িত।
অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায় করা হয়। মুক্তিপণ না পেলে নির্যাতন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সাগরপথে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচারের চেষ্টা চালানোর ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়েছে।
২০২৫ সালের বিভিন্ন অভিযানে অপহরণ ও মানবপাচারের শিকার দেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, গত বছরের এক অভিযানে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের সময় নারী ও শিশুসহ ৬৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর র্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে আরও ৮৪ জনকে উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ক্যাম্পের ভেতরের অপরাধের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতিরও সম্পর্ক রয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল, বন ও দুর্গম পথ ব্যবহার করে অপরাধীরা দ্রুত অবস্থান বদল করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হলে পাহাড় বা সীমান্তপারের এলাকায় পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকে। এ কারণে অপহরণ ও সশস্ত্র অপরাধ দমনে অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
টেকনাফের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শীত মৌসুমে অপরাধপ্রবণতা বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। এ সময় অপহরণ ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্থানীয় মানুষ ও মিয়ানমার থেকে আসা কিছু রোহিঙ্গাকে প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের চেষ্টা করা হয়। ইতিমধ্যে কয়েকটি চক্রের সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং ভুক্তভোগীদের উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
অস্ত্রের ব্যবহার এ অপরাধজগতকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। ২০২০ সালের দিকে টেকনাফ ও উখিয়ার ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে একাধিক সশস্ত্র ডাকাত দলের তৎপরতার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। জকির, পুতিয়া, সালমান শাহ, খাইরুল আমিন, নুর হোছনসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত কয়েকটি দলের কথা সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে বলা হয়েছিল। এসব দলের কয়েকটির বিরুদ্ধে মাদক, অপহরণ ও অস্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।
২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত কয়েক হাজার আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রকাশ করেছিল। পরবর্তী সময়েও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালের জুনে এম-১৬ রাইফেল উদ্ধারের ঘটনা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
অস্ত্রের সঙ্গে মাদকের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। মিয়ানমার সীমান্তের নৈকট্যের কারণে ইয়াবার চালান ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় প্রবেশের সুযোগ পায়। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধে অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে।

১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। ৮ এপিবিএনের অভিযানে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র ও ইয়াবা উদ্ধারের পাশাপাশি অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে ক্যাম্পের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু মাদক বা অস্ত্র নয়; সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও উদ্বেগের কারণ। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো গোষ্ঠী তরুণদের নিজেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করে। একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হলে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার কোনো গোষ্ঠীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালেও হুমকি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২০২২ সালে আরসার বিরুদ্ধে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করা রোহিঙ্গা নেতা, মাঝি ও স্বেচ্ছাসেবকেরা তখন বিভিন্ন ধরনের হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। মুহিবুল্লাহ হত্যার পর ক্যাম্পের ভেতরে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে—এমন বিশ্লেষণও তখন সামনে আসে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেছিলেন, দীর্ঘদিন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আটকে থাকা, জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। সেই পরিস্থিতি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
‘কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলন’-এর নেতারাও দীর্ঘস্থায়ী ক্যাম্পজীবনের সঙ্গে অপরাধ বৃদ্ধির সম্পর্কের কথা বলে আসছেন। তাঁদের মতে, মাদক ও মানবপাচারের অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সংঘাত বাড়ছে।
তবে ক্যাম্প থেকে অপরাধ ব্যাপকভাবে বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে—এমন দাবির ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। উখিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছিলেন, ক্যাম্পের ভেতর থেকে অপরাধ বাইরে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। ক্যাম্পে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অপরাধ দমনে বর্তমানে ৮, ১৪ ও ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। ক্যাম্পে গোয়েন্দা নজরদারি, রাতের পাহারা, অস্ত্র ও মাদকবিরোধী অভিযান এবং অপহরণকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সিরাজ আমিন বলেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার মধ্যে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হলেও জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অভিযান দিয়ে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে অপরাধের উৎস বন্ধ করতে হলে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। সীমান্তপথে মাদক ও অস্ত্রের প্রবেশ বন্ধ করা, পাহাড়ি এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, অপহরণ ও মানবপাচারের স্থানীয় দালালদের চিহ্নিত করা এবং ক্যাম্পের ভেতরে সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এর সঙ্গে রয়েছে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন—প্রত্যাবাসন। ২০১৭ সালের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ রোহিঙ্গা এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ক্যাম্পে জনসংখ্যার চাপ কমার বদলে অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে।
রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা ছাড়া মিয়ানমারে ফিরতে রাজি নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন অবস্থান করায় ক্যাম্পগুলো ঘিরে তৈরি হয়েছে একটি স্থায়ী সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এই দীর্ঘস্থায়িত্বই সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক কারবারি, মানবপাচারকারী ও অন্যান্য অপরাধী চক্রকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোহিঙ্গা সংকট তাই এখন শুধু মানবিক বা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি কক্সবাজারের স্থানীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মাদক ও মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। ক্যাম্পে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ না হলে সংকটটি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।