গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। শনিবার সকালে রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে শুরু হওয়া লংমার্চটি নারায়ণগঞ্জ হয়ে দুপুরে কুমিল্লায় পৌঁছায়। পথে একাধিক পথসভায় জোটের শীর্ষ নেতারা ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, জনগণের দাবি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলন আরও জোরদার হবে।
লংমার্চকে সরকার পতনের কর্মসূচি নয়, বরং সরকারের জন্য একটি ‘ওয়েক-আপ কল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। অন্যদিকে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, সরকার জনগণের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, লংমার্চে বাধা দেওয়া হলে ছয় দফা দাবি এক দফায় রূপ নিতে পারে।
শনিবার সকাল সাতটার দিকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশ শুরু হয়। পরে সকাল সাড়ে আটটার দিকে সেখান থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে লংমার্চের গাড়িবহর যাত্রা করে। কর্মসূচিতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নিচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড ট্রাকস্ট্যান্ড মাঠে অনুষ্ঠিত পথসভায় শফিকুর রহমান বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রক্তের বিনিময়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার সবকিছু এখনো পূরণ হয়নি। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য ও সুশাসনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত ১১ দলীয় ঐক্য রাজপথে থাকবে।
সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “এই সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না।” জনগণের অধিকার নিয়ে ‘ছিনিমিনি’ খেললে সরকারও জনগণের কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই ধরনের বক্তব্য তিনি সকালে শাপলা চত্বরের সমাবেশেও দেন।
নারায়ণগঞ্জের পথসভা শেষে লংমার্চটি কুমিল্লার দিকে রওনা হয়। দুপুরে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, তাঁদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। কুমিল্লায় পৃথক তিনটি পথসভা আয়োজনের কথা জানিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য।
একই পথসভায় সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, বর্তমান কর্মসূচি সরকারের পদত্যাগ বা পতনের আন্দোলন নয়। তাঁর ভাষায়, “এটা সরকারের জন্য ওয়েক-আপ কল।” তিনি বলেন, জনগণের চাহিদা ও দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরাই এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য। আন্দোলনের পর সরকার সমস্যাগুলো উপলব্ধি করে যৌক্তিক পরিকল্পনা নেবে বলে তিনি আশা করেন।
জোটের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আগের দিনও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছিলেন, তাঁরা সরকার উৎখাতের আন্দোলন করছেন না। তাঁদের লক্ষ্য গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং ছয় দফা দাবি আদায়। লংমার্চকে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি হিসেবে বর্ণনা করে প্রশাসনের সহযোগিতাও চেয়েছিলেন তিনি।
তবে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে সরকারের প্রতি অপেক্ষাকৃত কড়া বার্তা এসেছে। শাপলা চত্বরের উদ্বোধনী সমাবেশে তিনি বলেন, যত বাধাই আসুক, লংমার্চ চট্টগ্রাম পৌঁছাবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’র প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এবার তাঁদের কর্মসূচি “নতুন করে যারা স্বৈরাচার হতে যাচ্ছে, সেই পথ বন্ধ করার জন্য।”
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বর্তমান লংমার্চ শুধু ১১ দলের কর্মসূচি নয়, এটি সাধারণ মানুষের কর্মসূচি। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধেও এ কর্মসূচি বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকার বাধা দিলে “ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে।”
লংমার্চ ঘিরে জোটের পক্ষ থেকে প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার গাড়ি অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে এনসিপি নেতা আখতার হোসেন শনিবার জানিয়েছেন, পাঁচ থেকে ছয় হাজার গাড়ির পরিবর্তে প্রায় এক হাজার গাড়ি নিয়ে কর্মসূচি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিরোধী দল এখনো সরকারকে সময় দিতে প্রস্তুত, তবে সেই সময় জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে।
১১ দলীয় ঐক্যের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং দলীয়করণ বন্ধ করা।
সরকারের পক্ষ থেকেও বিরোধীদের এ কর্মসূচি নিয়ে প্রতিক্রিয়া এসেছে। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি শুক্রবার বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বিরোধী দলকে সময়ের বাস্তবতা বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপি সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১১ দলীয় ঐক্য সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও একাধিক কর্মসূচি পালন করেছে। এপ্রিল থেকে প্রায় প্রতি মাসেই সমাবেশ, অবস্থান ও অন্যান্য কর্মসূচি হয়েছে। শনিবারের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চকে এখন পর্যন্ত জোটের সবচেয়ে বড় রাজপথের কর্মসূচিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী, কুমিল্লার পর ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে পথসভা হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জনসভার মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা।
তবে বিকেল পর্যন্ত পাওয়া নির্ভরযোগ্য সংবাদে লংমার্চের গাড়িবহর চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে পৌঁছেছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচি কুমিল্লা অতিক্রম করে চট্টগ্রামমুখী রয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রামের পর ১১ দলীয় ঐক্য আরও কয়েকটি লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সর্বশেষ দলীয় সূচি অনুযায়ী ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ হবে। এরপর খুলনা ও সিলেট অভিমুখে কর্মসূচি এবং নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ঘোষিত তারিখে কিছু পরিবর্তন এসেছে; প্রথম আলোর সর্বশেষ প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের পর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চের কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে শনিবারের কর্মসূচির তাৎপর্য এখানেই যে, ১১ দলীয় ঐক্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার পতনের ডাক না দিলেও নেতাদের বক্তব্যে চাপ বাড়ানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। একদিকে জোটের শীর্ষ নেতারা সরকারকে সময় দেওয়ার কথা বলছেন, অন্যদিকে গণভোটের রায় ও জনদুর্ভোগের প্রশ্নে দাবি পূরণ না হলে আন্দোলনের ধরন বদলে যেতে পারে—এমন সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন।
ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চকে শুধু একটি দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে সরকার ও বিরোধী জোটের আগামী দিনের সম্পর্কের পরীক্ষাও হিসেবে দেখা হচ্ছে। চট্টগ্রামের সমাপনী জনসভা থেকে ১১ দলীয় ঐক্য নতুন কোনো রাজনৈতিক বার্তা বা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করে কি না, এখন নজর থাকবে সেদিকে।