- ট্রাকভাড়া বেড়েছে ৩ থেকে ৮ হাজার টাকা, বাড়তি খরচের প্রভাব পড়ছে সবজি থেকে গণপরিবহনে
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জনজীবনে। পরিবহন খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবজি ও নিত্যপণ্যের দাম, পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবার ব্যয়ও বাড়ছে। সরকারের নতুন ভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত আসার আগেই বিভিন্ন রুটে বাড়তি বাসভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
রোববার মধ্যরাত থেকে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। এর আগে গত এপ্রিলে এসব জ্বালানির দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
দাম বাড়ার পরপরই পরিবহন খাতে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার সাদেক খান কৃষি মার্কেটে পঞ্চগড় ও খুলনা থেকে সবজি এনে বিক্রি করেন আড়তদার মো. ইদ্রিস ফকির। তিনি জানান, এক দিনের ব্যবধানে তাঁর পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে কয়েক হাজার টাকা। ইদ্রিস ফকির বলেন, শনিবার রাতে পঞ্চগড় থেকে ঢাকার ট্রাকভাড়া ছিল ২৬ হাজার ৫০০ টাকা। সোমবার তা বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা। খুলনা থেকে ট্রাক আনার ভাড়াও ১৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, “ট্রাকের ভাড়া চার হাজার টাকা বাড়তি; এই চার হাজার টাকার খরচ কি মালামালের ওপর পড়বে না?” তাঁর মতে, বাড়তি পরিবহন ব্যয় শেষ পর্যন্ত সবজির দামে যোগ হবে।
মানিকগঞ্জ থেকে সবজি এনে বিক্রি করেন পাইকারি ব্যবসায়ী মো. সাজু রহমান। তাঁর ভাষ্য, ২ হাজার ৬০০ টাকার ট্রাকভাড়া বেড়ে এক দিনে ৩ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। বাড়তি খরচ নিজের পকেট থেকে না দিয়ে ক্রেতার কাছ থেকেই নিতে হবে বলে জানান তিনি।
শুধু পণ্য পরিবহন নয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে পিকআপ চালকদের ওপরও। সিংগাইর থেকে প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন বাজারে পণ্য পরিবহন করেন আমির বিশ্বাস। তিনি বলেন, প্রতিদিন তাঁর ২০ থেকে ২৫ লিটার ডিজেল লাগে। আগে নির্দিষ্ট ট্রিপের জন্য ২ হাজার টাকা ভাড়া পেলেও সোমবার মালিক ভাড়া ২ হাজার ৫০০ টাকা করার কথা জানিয়েছেন। এতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চালকদের বাকবিতণ্ডাও হচ্ছে বলে জানান তিনি।
গণপরিবহনেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২০ পয়সা এবং মহানগর এলাকায় ১৮ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়েছেন পরিবহন মালিকেরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএসএম আহম্মেদ খোকন বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে একটি বাসে শুধু জ্বালানি বাবদ প্রায় ৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেই অনুযায়ী বাসভাড়া বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।
তবে সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। ঢাকার বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ থেকে ২০ টাকা এবং দূরপাল্লার বাসে কোথাও কোথাও ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে স্থলবন্দরেও। বেনাপোলে স্থানভেদে ট্রাকভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাক মালিকেরা ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ভাড়া বাড়িয়েছেন। এতে ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন। পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের খরচও বেড়েছে। বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইসিডিএ) গড়ে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ চার্জ বাড়িয়েছে।
নিম্নআয়ের মানুষের ওপরও বাড়তি ব্যয়ের চাপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মহাখালী এলাকায় রিকশা চালানো মকবুল মিয়া বলেন, সারাদিনে তাঁর আয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এর মধ্যে জমা দিতে হয় ১৫০ টাকা। নিত্যপণ্য ও ওষুধের খরচ মেটানোর পর সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান তিনি।
সরকার অবশ্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজার ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের চাপকে কারণ হিসেবে তুলে ধরছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দাম সমন্বয় না করলে টিকা কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কম মূল্যে খাদ্য সরবরাহের মতো সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত বা স্থগিত হতে পারত।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার অর্থনৈতিক চাপ বাংলাদেশকেও বহন করতে হয়। সরকার ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ একসঙ্গে না দিয়ে একটি অংশ বহন করলে শেষ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার প্রেক্ষাপটে দেশের বাজারে এক লাফে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন সংগঠন। তারা অবিলম্বে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের খরচ আরও বাড়বে। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতিও জ্বালানির বাড়তি দাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্য, মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় যাতায়াত, পণ্য পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ কভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়া অনিবার্য। এর প্রভাব পরিবহন খাতের বাইরে পণ্যের বাজারেও পড়বে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলমের মতে, জ্বালানি সেবা দিতে সরকারের যে পরিমাণ ব্যয় হয়, মূলত সেই ব্যয় ও সহনীয় মাত্রার রাজস্ব বিবেচনায় নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। তাঁর অভিযোগ, সরকারের রাজস্ব আহরণের চাপ সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে।
ফলে জ্বালানি তেলের নতুন দামের প্রভাব এখন শুধু পাম্পে সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাক ও বাসের ভাড়া থেকে সবজি, নিত্যপণ্য, কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং নিম্নআয়ের মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়—বিভিন্ন স্তরে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। আগামী দিনে গণপরিবহনের ভাড়া ও পণ্যের বাজারে এই চাপ কতটা বাড়ে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।