- মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ, জরুরি অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ায় জোর; নয় বছরে একবারও শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন
রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছরে এসে বাংলাদেশ আবারও তিনটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার সামনে এনেছে—মিয়ানমারের ওপর সমন্বিত কূটনৈতিক চাপ, মানবিক সহায়তায় জরুরি ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহিতা জোরদার করা। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের পাশাপাশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) রোহিঙ্গা বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের যোগাযোগ দলের বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের বক্তব্য, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সংকট নয়; দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ তৈরি করছে। অনিয়মিত সমুদ্রযাত্রা, মানবপাচার, মাদকপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে। পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যে এসব উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, সংকট যত দীর্ঘ হবে, এসব ঝুঁকিও তত বাড়বে।
বাংলাদেশের হিসাবে, দেশে এখন ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে আরও ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে বলে ঢাকার বক্তব্যে জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে কক্সবাজারে ১১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি এবং ভাসানচরে প্রায় ৩৩ হাজার ৮০০ জন রয়েছে।
সংকটের আরেকটি দিক হলো জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি। বাংলাদেশ বলছে, প্রতিবছর রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের হিসাবেও ক্যাম্পে জনসংখ্যা ও প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মকর্তা মার্সেল কোলুন আগস্টে বলেন, ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৯০টি শিশুর জন্ম হচ্ছে এবং মিয়ানমার থেকে নতুন করে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদেরও আসতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রথম প্রস্তাব মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো। ঢাকার চাওয়া, জাতিসংঘ ও আসিয়ানের সঙ্গে সমন্বয় করে মিয়ানমারের ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি করা হোক, যাতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়। বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই।
সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে ওআইসির অবস্থানও বাংলাদেশের দাবির সঙ্গে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে ওআইসি মন্ত্রী পর্যায়ের যোগাযোগ দল মিয়ানমারকে সংকটের মূল কারণ মোকাবিলা, রোহিঙ্গাদের অধিকার—বিশেষ করে পূর্ণ নাগরিকত্ব—পুনর্বহাল, মুসলিম জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়েছে।
তবে প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধা এখন রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশ যে তালিকা দিয়েছে তার মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার মানুষকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না—এ অবস্থানও জানিয়েছে তারা।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার কথা বলা হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই রোহিঙ্গাদের ওপর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রস্তাব অর্থায়ন। ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (JRP) রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার প্রয়োজন। কিন্তু এই আবেদন ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। জাতিসংঘ স্পষ্ট করেছে, চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে এই অঙ্ক কমানো হয়নি; বরং আন্তর্জাতিক মানবিক তহবিল সংকুচিত হওয়ায় এটি ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর জন্য পুনর্নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা।
জাতিসংঘের হিসাবে, এই অর্থের মধ্যে খাদ্য খাতে ২৪ কোটি ৭৩ লাখ, আশ্রয়ে ১২ কোটি ৮০ লাখ, পানি ও স্যানিটেশনে ৬ কোটি ১২ লাখ, শিক্ষায় ৫ কোটি ২৭ লাখ এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৫ কোটি ডলার প্রয়োজন। স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্যও ৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার রাখা হয়েছে।
অর্থসংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। জাতিসংঘ বলছে, ২০২৫ সালে প্রায় ৩৫ শতাংশ ক্যাম্প পরিবার পুরোপুরি মানবিক খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। মাত্র ২৩ শতাংশ পরিবার নগদভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে আয় করার সুযোগ পেয়েছে। সহায়তা কমে গেলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার মতো মৌলিক সেবায় চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে বাংলাদেশের বক্তব্য শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থ নয়, তাদের আশ্রয় দিয়ে আসা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার ভাষায়, প্রায় এক দশক ধরে এই বোঝা একা বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।
তৃতীয় প্রস্তাব আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহিতা। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে ওআইসি সদস্যদের সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার করা মামলায় ওআইসির ভূমিকা অব্যাহত রাখার কথা বলেছে ঢাকা। বাংলাদেশ সম্প্রতি রোহিঙ্গা বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য ওআইসির একটি তহবিলে প্রায় ১৩ লাখ ডলার দিয়েছে বলেও জানিয়েছে।
আইসিজেতে গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলার সর্বশেষ অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মামলার মূল বিষয়ে প্রকাশ্য শুনানি শেষ হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি আদালত জানায়, তারা রায় নিয়ে deliberation বা পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করেছে; রায় ঘোষণার তারিখ পরে জানানো হবে। অর্থাৎ মামলাটি এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
এই মামলায় গাম্বিয়া ওআইসির ৫৭ সদস্যের পক্ষে ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদের অধীনে মামলা করে। ২০২২ সালে আইসিজে মিয়ানমারের প্রাথমিক আপত্তি খারিজ করে মামলাটি গ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দেয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক দেশ মামলায় হস্তক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—মানবিক সহায়তা দিয়ে সংকটকে সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব, কিন্তু এর স্থায়ী সমাধান হবে না। জাতিসংঘও বলছে, রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও টেকসই সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। যত দিন সেই পরিবেশ তৈরি না হচ্ছে, তত দিন আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।
ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা মার্সেল কোলুনও সতর্ক করেছেন, অর্থায়ন কমে যাওয়ার বাস্তবতায় রোহিঙ্গা সহায়তা ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরতার দিকে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, রাখাইনে চলমান সংঘাত প্রত্যাবাসনকে আরও কঠিন করে তুলছে।
ফলে ঢাকার তিন প্রস্তাবের প্রতিটির সঙ্গে সংকটের আলাদা একটি বাস্তবতা যুক্ত। কূটনৈতিক চাপ ছাড়া মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি কঠিন, অর্থায়ন ছাড়া বাংলাদেশে মানবিক পরিস্থিতি ধরে রাখা কঠিন, আর জবাবদিহিতা ছাড়া ভবিষ্যতে একই ধরনের নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন। ওআইসি ইতিমধ্যে পূর্ণ নাগরিকত্ব, অধিকার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে সমর্থন জানিয়েছে। এখন সেই রাজনৈতিক অবস্থান কতটা কার্যকর কূটনৈতিক চাপ ও অর্থায়নে রূপ নেয়, সেটিই রোহিঙ্গা সংকটের পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
প্রায় নয় বছর পরও কোনো বড় আকারের প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া, রাখাইনে চলমান সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়া—এই তিন বাস্তবতা দেখাচ্ছে যে সংকটটি আগের চেয়ে আরও জটিল হয়েছে। তাই বাংলাদেশের তিন প্রস্তাব মূলত একটি প্রশ্নের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ফেরাতে চাইছে: রোহিঙ্গাদের শুধু বাঁচিয়ে রাখা নয়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার বাস্তব পরিবেশ তৈরি হবে কবে?