- স্মার্ট চশমায় ছবি-ভিডিও ধারণ, ভয়েস কমান্ড ও এআই সুবিধা; অজান্তে রেকর্ডিং নিয়ে উদ্বেগ, আইনি সুরক্ষায়ও তৈরি হয়েছে ফাঁক
চশমা এখন আর শুধু চোখের দৃষ্টি ঠিক রাখা বা রোদ থেকে সুরক্ষার উপকরণ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সংযোজনে চশমা হয়ে উঠছে ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ, ফোনে কথা বলা, গান শোনা এবং ভয়েস কমান্ডে তথ্য পাওয়ার প্রযুক্তি। ভারতের বাজারে মেটার রে-ব্যান স্মার্ট গ্লাসের একাধিক সংস্করণ নিয়ে ব্যবহারকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাইসহ বিভিন্ন শহরে দোকান ও অনলাইন বাজারে এ ধরনের চশমার উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে।
তবে প্রযুক্তির এই নতুন সুবিধার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে। কারণ, সাধারণ চশমার মতো দেখতে এসব ডিভাইসে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন থাকে। ফলে একজন ব্যক্তি তাঁর অজান্তেই ছবি বা ভিডিও ধারণের শিকার হতে পারেন। ইতোমধ্যে ভারতে এমন অভিযোগে পুলিশি মামলাও হয়েছে।
মেটা ও রে-ব্যানের তৈরি স্মার্ট গ্লাসে ক্যামেরা, একাধিক মাইক্রোফোন এবং ওপেন-ইয়ার স্পিকার থাকে। ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে ব্যবহারকারী এআইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন কিংবা বিভিন্ন কাজের নির্দেশ দিতে পারেন। ছবি ও ভিডিও ধারণ, কল করা, গান শোনা এবং কিছু ক্ষেত্রে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মতো কাজও হাত ব্যবহার না করেই করা সম্ভব।
প্রযুক্তিটির সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো ক্যামেরা। ব্যবহারকারীর দৃষ্টিসীমার সামনে থাকা কোনো দৃশ্য দ্রুত ধারণ করা যায়। ফলে ভ্রমণ, খেলাধুলা, দৈনন্দিন কাজ কিংবা হাতে ফোন ব্যবহার করা অসুবিধাজনক এমন পরিস্থিতিতে এটি কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু একই বৈশিষ্ট্য অন্য মানুষের জন্য তৈরি করতে পারে গোপনীয়তার ঝুঁকি। কারণ, ক্যামেরাটি চশমার ফ্রেমে এমনভাবে বসানো যে দূর থেকে বোঝা কঠিন হতে পারে কেউ ভিডিও ধারণ করছেন কি না।
ভারতে এই উদ্বেগের বাস্তব উদাহরণও সামনে এসেছে। কলকাতার ৩৫ বছর বয়সী কলেজ শিক্ষিকা বিদিশার অভিযোগ, রাতে বাড়ি ফেরার পথে এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় গোপনে ভিডিও ধারণ করেন। পরদিন ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
বিদিশার দাবি, তিনি ওই ব্যক্তির হাতে কোনো ক্যামেরা দেখতে পাননি। পরে জানতে পারেন, তিনি স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন আপত্তিকর মন্তব্যও করা হয়। ঘটনাটি তাঁর জন্য ব্যক্তিগত হয়রানি ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে তিনি জানিয়েছেন।
দিল্লিতেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। ‘স্কাই’ নামে পরিচিত ২৯ বছর বয়সী এক ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি যন্তরমন্তরে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় তাঁর অজান্তে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
এ ধরনের ঘটনায় প্রযুক্তির সুবিধা ও অপব্যবহারের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে জনসমাগমস্থলে কাউকে তাঁর সম্মতি ছাড়া ধারণ করা হলে সেটি কোন পর্যায়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর সব ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অরিজিৎ মুখার্জির মতে, এ ধরনের স্মার্ট চশমার বড় সমস্যা হলো এগুলো দেখতে সাধারণ চশমার মতো। ফলে আশপাশের মানুষ সব সময় বুঝতে পারেন না যে তাঁদের ছবি বা ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে।
তাঁর দাবি, চশমায় রেকর্ডিংয়ের সময় যে এলইডি আলো জ্বলে, দিনের আলোতে তা সহজে চোখে নাও পড়তে পারে। ফলে ক্যামেরা সক্রিয় থাকার বিষয়টি শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
তবে মেটার বক্তব্য ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের প্রতিটি স্মার্ট গ্লাসে রেকর্ডিং এলইডি থাকে এবং ছবি বা ভিডিও ধারণের সময় সেটি জ্বলে। এই আলো বন্ধ করার কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা নেই। কেউ আলোটি ঢেকে দিলে বা নষ্ট করার চেষ্টা করলে ক্যামেরা কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে মেটা জানিয়েছে।
অর্থাৎ প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি গোপনীয়তার সুরক্ষায় একটি দৃশ্যমান সংকেত রাখলেও বাস্তবে সেটি আশপাশের মানুষ কতটা সহজে দেখতে বা বুঝতে পারছেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আরেকটি উদ্বেগ হলো ধারণ করা ছবি ও ভিডিও কোথায় যাচ্ছে এবং কতক্ষণ সংরক্ষিত থাকছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কিঞ্জল কান্তি ঘোষের মতে, স্মার্ট চশমার মাধ্যমে কারও অজান্তে ছবি ধারণ শুধু ব্যক্তিগত হয়রানির বিষয় নয়; তথ্য নিরাপত্তার দিক থেকেও এর ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিআইপি বা সংবেদনশীল স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্তও গোপনে ধারণ করা সম্ভব। তবে এসব সম্ভাব্য অপব্যবহারকে ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করবে ডিভাইসের ব্যবহার, তথ্য সংরক্ষণ, সফটওয়্যারের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কাঠামোর ওপর।
আইনি দিকটিও জটিল। প্রযুক্তিবিষয়ক আইনজীবী ও নাগরিক অধিকারকর্মী মিশি চৌধুরীর মতে, জনসমাগমস্থলে কারও অজান্তে ভিডিও ধারণের জন্য ভারতের আইনে সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য একটি নির্দিষ্ট বিধান নেই। তবে ঘটনাভেদে মানহানি, স্টকিং, হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা অন্য আইনি ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সেটি সরানোও আরেকটি সমস্যা। কোনো ভিডিও হয়রানি বা উত্যক্তকরণের আওতায় পড়লে প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ করার সুযোগ থাকলেও স্মার্ট গ্লাস দিয়ে সম্মতি ছাড়া ধারণ করা ভিডিওর জন্য আলাদা অভিযোগের শ্রেণি সব ক্ষেত্রে নেই। ফলে ভুক্তভোগীকে সাধারণত হয়রানি বা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মতো বিদ্যমান ক্যাটাগরির মাধ্যমে অভিযোগ করতে হয়।
বিদিশার ঘটনায়ও ভিডিওটি দীর্ঘ সময় অনলাইনে ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে পুলিশ অভিযুক্তকে ভিডিও সরাতে বললে সেটি সরানো হয়। ঘটনাটি দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে একবার ব্যক্তিগত কোনো মুহূর্ত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কতটা কঠিন।
এর মধ্যেই ভারতে স্মার্ট চশমার বাজারে আগ্রহ বাড়ছে। বিভিন্ন অনলাইন বিক্রেতার তথ্য অনুযায়ী, মেটার দ্বিতীয় প্রজন্মের স্মার্ট গ্লাসের দাম প্রায় ৩৯ হাজার ৯০০ টাকা থেকে শুরু হচ্ছে; ফ্রেমসহ কিছু সংস্করণের দাম ৪৫ হাজার টাকার বেশি। প্রথম প্রজন্মের মডেলগুলো ছাড়ে প্রায় ২২ থেকে ২৭ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। তবে ভারতে মোট কতটি ডিভাইস বিক্রি হয়েছে, সে বিষয়ে মেটার নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশিত না হওয়ায় বাজারের আকার নিয়ে নিশ্চিত সংখ্যা দেওয়া যাচ্ছে না।
ফলে ভারতের বাজারে এই প্রযুক্তির প্রকৃত বিক্রির পরিমাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এর সামাজিক প্রভাব। একটি সাধারণ দেখতে চশমার মধ্যে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও এআই যুক্ত হওয়ার অর্থ হলো—ছবি তোলা ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা এখন আরও অদৃশ্য হয়ে উঠছে।
মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের নীতিমালা অনুযায়ী কাউকে হেনস্তা বা অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ গ্রহণযোগ্য নয়। ইনস্টাগ্রাম প্রধান অ্যাডাম মোসেরিও বলেছেন, মানুষকে গোপনে ভিডিও ধারণ করে হয়রানি করার মতো কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মে রাখা হবে না। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ম লঙ্ঘনকারী বিভিন্ন ভিডিও ও পোস্ট সরানোর কথাও জানিয়েছে।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—আইন, প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম নীতিমালা কি নতুন এই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে?
এআই চশমা মানুষের হাতকে মুক্ত করে প্রযুক্তিকে আরও সহজলভ্য করছে। কিন্তু একই সঙ্গে অন্য মানুষের সম্মতি ছাড়াই ছবি ও ভিডিও ধারণের ক্ষমতাও আরও সহজ করে দিচ্ছে। তাই এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু বিক্রির সংখ্যা বা নতুন ফিচারের ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যের মালিকানা, সম্মতি এবং অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।
ভারতের বর্তমান অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করছে—স্মার্ট চশমা নিছক নতুন একটি গ্যাজেট নয়। এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের সীমা নিয়ে নতুন ধরনের আইনি ও সামাজিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।