ডোপ টেস্টেও শনাক্ত অনেকে; অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগসাজশ

মাদক সেবন ও কারবারে জড়াচ্ছে পুলিশ, নিয়ন্ত্রণ করবে কে

বিশেষ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১০
 ছবি:

ইয়াবাসহ বিপুল মাদক নিয়ে গ্রেপ্তার পুলিশ সদস্য, ডোপ টেস্টে শনাক্ত পুলিশ সুপারও; ভাটারায় অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া বাড়িতে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় নতুন প্রশ্ন

যাদের হাতে মাদক নির্মূলের দায়িত্ব, তাদেরই কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন মাদক সেবন, পাচার ও কারবারে। মাদক মামলার আলামত সংরক্ষণ ও ধ্বংসের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হচ্ছেন ইয়াবাসহ। থানায় কর্মরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই), কনস্টেবলসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্যের বিরুদ্ধে উঠছে মাদক কারবারের অভিযোগ। ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাও। সর্বশেষ রাজধানীর ভাটারায় এক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত ডিআইজি) মালিকানাধীন ভাড়া বাড়িতে মাদক উদ্ধার ও নারীসহ ৮৪ জনকে আটকের ঘটনা পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।

গত কয়েক মাসে ঢাকা, রংপুর, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নাটোর, বগুড়া, বরিশাল ও কিশোরগঞ্জে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত একাধিক ঘটনা ঘটেছে। কোথাও ইয়াবা পরিবহন ও বিক্রির অভিযোগে গ্রেপ্তার, কোথাও মাদক সেবনের আসরে আটক, আবার কোথাও ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন অপরাধের উদাহরণ, নাকি নজরদারি ও জবাবদিহির দুর্বলতার বড় কোনো চিত্রের অংশ—তা নির্ধারণে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়োজিত সদস্যদের কেউ অপরাধে জড়ালে ক্ষতি শুধু সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ভাবমূর্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাদক কারবারিদের কাছে গোপন তথ্য পৌঁছে দেওয়া, অভিযানের খবর ফাঁস, জব্দ মাদকের অপব্যবহার কিংবা অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার মতো ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই পুরো বাহিনীকে দায়ী করা যায় না। প্রয়োজন অভিযুক্ত ব্যক্তির দায় নির্ধারণ, অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র অনুসন্ধান এবং প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি নিশ্চিত করা।

একের পর এক ঘটনায় পুলিশের নাম

গত ১৫ অক্টোবর রাতে রংপুর নগরীর পায়রা চত্বর এলাকার স্কাইভিউ হোটেলের সপ্তম তলার ৭১০ নম্বর কক্ষে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সেখান থেকে ১৯টি ইয়াবা বড়ি ও মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ রংপুর জেলা পুলিশের কনস্টেবল মিঠুন ইসলাম (২৯) এবং সাবেক কনস্টেবল ওমর আলীকে (৩৭) গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত তাঁদের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলার অভিযোগ ও উদ্ধার করা আলামতের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে।

এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা বাইপাস এলাকায় ৫৬ বোতল কোরেক্স সিরাপসহ দুই পুলিশ কনস্টেবল মোস্তাইন বিল্লাহ ও নাজমুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। একই মাসের ৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্য মোহাম্মদ আলী মুন্না শিকদারকে গ্রেপ্তার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তাঁর কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল, দুটি আইফোন ও ৫০ হাজার ৯৯০ টাকা জব্দ করা হয়।

চট্টগ্রামে গত ৫ মে কক্সবাজার থেকে ইয়াবা নিয়ে যাওয়ার পথে খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল আশিকুল ইসলাম ৫০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। এর চার দিন আগে ১ মে রামুতে ২০ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএনের অষ্টম ব্যাটালিয়নের কনস্টেবল সজিব ব্যাপারীকে আটক করে বিজিবি। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার কনস্টেবল মনিরুল ইসলাম ১০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। কক্সবাজার থেকে মোটরসাইকেলে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে তাঁকে আটক করা হয়।

রাজধানীতেও মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের নাম এসেছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর সূত্রাপুরে ১ হাজার ৭৯০টি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন কনস্টেবল মো. রেজাউল করিম। তিনি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আলামত নিষ্পত্তি ও মাদক ধ্বংসসংক্রান্ত শাখায় দায়িত্ব পালন করতেন। একটি খাবারের দোকানে ইয়াবা বিক্রির উদ্দেশ্যে অবস্থানের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে রেজাউল অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, ইয়াবা তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হয়নি; তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানে সেগুলো পড়ে ছিল। তাঁর বক্তব্যের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়ার বিষয়।

গত ২৪ আগস্ট দক্ষিণখানে মাদক কারবারের অভিযোগে পল্লবী থানার এএসআই মো. শফিকুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগী ওয়াসিম গ্রেপ্তার হন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে ওয়াসিমের কাছ থেকে ৫০টি, পরে শফিকুলের কাছ থেকে ২০০টি এবং আরেকটি ফ্ল্যাট থেকে ৫ হাজার ১১০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে।

শফিকুলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও ছিল। পল্লবী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, জুন মাসেই তাঁর অনুপস্থিতির বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল। তারপরও তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কার্যকর নজরদারি ছিল কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে। কোনো সদস্য দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকার কথা। কিন্তু তথ্য থাকার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রশাসনিক তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর নাটোরের লালপুরে ১০৬টি ইয়াবাসহ রাজশাহী রেঞ্জের রিজার্ভ ফোর্সের কনস্টেবল আল আমিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে দুটি মোটরসাইকেল ও নগদ ৩২ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। ২৩ মে বগুড়ার তিনমাথা রেলগেট এলাকায় ক্রেতা সেজে অভিযান চালিয়ে ৩০০টি ইয়াবাসহ সাইদুর রহমান ও আব্দুল ওয়াহাবকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। সাইদুর জয়পুরহাট জেলা পুলিশের সদস্য হলেও প্রায় দুই মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। আব্দুল ওয়াহাব ছিলেন চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য। তাঁদের বিরুদ্ধে বাসা ভাড়া নিয়ে মাদক কারবার চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

গত ৮ অক্টোবর বরিশালের দক্ষিণ কড়াপুর এলাকায় মাদক সেবনের আসরে অভিযান চালিয়ে বিমানবন্দর থানার এএসআই দেলোয়ার হোসেনসহ চারজনকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ঘটনাস্থলে মাদক সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া গেলেও মাদক উদ্ধার হয়নি বলে জানা যায়। অভিযানের সময় দেলোয়ার পালানোর চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই অভিযানে আটক অন্য দুজনের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় তাঁদের ২০ দিনের কারাদণ্ড হয়। কিন্তু দেলোয়ারের ডোপ টেস্ট হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ ঘটনায় সবার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ডে পরীক্ষা ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

পুলিশ সদস্যদের মাদকসম্পৃক্ততার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে রাজধানীর ভাটারার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান। গত ১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে শুরু হওয়া এ অভিযানে ২৬ নারীসহ ৮৪ জনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁদের মধ্যে ৫৮ জন পুরুষ এবং একজন আফগান নাগরিক রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে আটকের সংখ্যা ৮৫ বলা হলেও পুলিশের একাধিক বিবরণে ৮৪ জনের তথ্য এসেছে। তাই চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করতে আটক ব্যক্তিদের তালিকা ও মামলার নথি যাচাই করা প্রয়োজন। বাড়িটি পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন। পুলিশের ভাষ্য, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাড়িটি স্বল্পমেয়াদে ভাড়া দেওয়া হতো এবং সেখানে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টির আয়োজন চলত। অভিযানে ইয়াবা, গাঁজা, অ্যালকোহল, আইস বা ক্রিস্টাল মেথামফেটামিন, কুশ, শিশা এবং মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে কোন ব্যক্তির কাছ থেকে কী পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়েছে এবং কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।

ডিবির কর্মকর্তাদের দাবি, বাড়িটির দেখভালের জন্য একজন হোস্ট ও একজন কো-হোস্ট ছিলেন। কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকেও আটক করা হয়েছে। পুলিশের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে আয় করা অর্থের ৭০ শতাংশ মালিক পেতেন এবং বাকি ৩০ শতাংশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা পেতেন। এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে বুকিংয়ের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, আয়-ব্যয়ের নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ঘটনার পর ২০ অক্টোবর আবদুল্লাহ আল জহিরকে তাঁর আগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অন্য শাখায় সংযুক্ত করা হয়। তিনি আগে রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখায় কর্মরত ছিলেন। এ প্রশাসনিক পদক্ষেপকে অপরাধে জড়িত থাকার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাড়ির মালিক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব কতটুকু ছিল, সেখানে কী ধরনের কর্মকাণ্ড চলত সে সম্পর্কে তিনি জানতেন কি না এবং ভাড়া ব্যবস্থাপনায় তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে নির্ধারণ করতে হবে।

আবদুল্লাহ আল জহিরের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে জন্মদিনসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে পারত। ভাড়ার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন থাকলেও ভাড়াটেরা সেগুলো ভঙ্গ করলে সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন—এমন যুক্তিও তিনি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা যাচাই করতে ভাড়ার শর্ত, অনলাইন বুকিং, হোস্ট ও কো-হোস্টের দায়িত্ব, পূর্ববর্তী অভিযোগ এবং অর্থ লেনদেনের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অভিযানে আটক ব্যক্তিদের কয়েকজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন এবং অন্যদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছিল বলে ডিবি জানিয়েছে। তবে কে কোন অভিযোগে সাজা পেয়েছেন, কার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হয়েছে এবং কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না—সেসব তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ করা দরকার। কোনো বাড়িতে উপস্থিত থাকা মানেই প্রত্যেক ব্যক্তি মাদক কারবারে জড়িত—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

ভাটারার ঘটনা তাই শুধু বাড়ির মালিকের পদ পরিবর্তন কিংবা কয়েকজনকে আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাড়িটি কত দিন ধরে এভাবে ভাড়া দেওয়া হচ্ছিল, নিয়মিত পার্টির আয়োজন হতো কি না, মাদক কোথা থেকে আসত, আয় ভাগাভাগির অভিযোগের সত্যতা কী এবং কোনো প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। বিশেষ করে একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার মালিকানাধীন স্থাপনা নিয়ে তদন্ত হওয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

ডোপ টেস্টে ১২৬ জন শনাক্ত, চাকরিচ্যুত ১১৬

পুলিশের অভ্যন্তরে মাদকসম্পৃক্ততার চিত্র উঠে এসেছে ডোপ টেস্টের পরিসংখ্যানেও। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ মার্চ থেকে ২০২৩ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত ১২৬ জন সদস্যের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১১৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৯৮ জন কনস্টেবল, ১১ জন উপপরিদর্শক (এসআই), সাতজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই), আটজন নায়েক, একজন পরিদর্শক এবং একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট ছিলেন। তবে এসব পদভিত্তিক সংখ্যা যোগ করলে মোট ১২৬-এর চেয়ে বেশি হয়। তাই পরিসংখ্যানটি পুনরায় যাচাই করে সঠিক পদভিত্তিক হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সাল থেকে ওই সময় পর্যন্ত আরও ১৭ জন পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৫ জন কনস্টেবল, একজন এএসআই ও একজন নায়েক ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে সেপ্টেম্বরে পুলিশ সুপার আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ার পর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাঁর নমুনায় বেনজোডায়াজেপিনস এবং অ্যামফিটামিন বা মেথঅ্যামফিটামিন শ্রেণির উপাদান শনাক্ত হওয়ার কথা প্রশাসনিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের চালক কনস্টেবল ওসমান গনির ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় তাঁকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা জানান।

তবে ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া এবং মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ এক বিষয় নয়। পরীক্ষার ফল, সংশ্লিষ্ট ওষুধ ব্যবহারের তথ্য, পরীক্ষার পদ্ধতি এবং প্রযোজ্য বিধি যাচাই করে বিভাগীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। একইভাবে মাদক কারবারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করতে হবে মামলার প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

‘আমাদের লোকজন জড়িত না থাকলে কারবারিরা এত সুযোগ পেত না’

পুলিশের ভেতরে মাদকসম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করেছেন অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “আমাদের লোকজনের সম্পৃক্ততা না থাকলে মাদক কারবারিরা এতটা সুযোগ পেত না। তবে সবাই এমন নয়। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে।” তিনি জানান, মাদকের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স। তদন্তে কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে ডোপ টেস্ট প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, যখন-তখন যেকোনো সদস্যের পরীক্ষা করানো সহজ নয়। সন্দেহের ভিত্তি, পরীক্ষার ব্যয় এবং পরীক্ষার ফল আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিতে হয়। এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শুধু শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নয়, পরীক্ষার একটি কার্যকর ও আইনসম্মত কাঠামোও প্রয়োজন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমানের মতে, প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার সদস্যের বিশাল বাহিনীতে কিছু ব্যক্তির অপরাধে জড়িয়ে পড়া পুরো বাহিনীর অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে পুলিশ সদস্য হওয়ার কারণে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নজরদারি, চালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ডোপ টেস্ট এবং পরীক্ষার ফল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর প্রক্রিয়া চলছে। ভবিষ্যতে পরীক্ষার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, মাদক সামাজিক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে; এর সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ জড়িত থাকায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হচ্ছেন। তাঁর মতে, মাদক প্রতিরোধের সামনের সারিতে থাকা ব্যক্তিরাই জড়িয়ে পড়লে সরকারের উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এজন্য সামাজিক প্রতিরোধের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়মিত নজরদারি, প্রয়োজনে ডোপ টেস্ট এবং মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।

পুলিশ সংস্কার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা আরও একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন সামনে আনেন—অভিযোগের তদন্ত কতটা স্বাধীন ও স্বচ্ছ। সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা পুলিশে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে পেশাগত যোগ্যতা এবং প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কার্যকর স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক মো. ফারদিন লাবিবের গবেষণাতেও পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে জনআস্থা পুনর্গঠন ও জবাবদিহি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁদের এসব বক্তব্য পুলিশ সংস্কার নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ; ভাটারার ঘটনা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য হিসেবে তা উপস্থাপন করা হচ্ছে না।

 নিয়ন্ত্রণে দরকার নজরদারি, স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

পুলিশ সদস্যদের মাদকসম্পৃক্ততার ঘটনা নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা চাকরিচ্যুতির ওপর নির্ভর করলে সমস্যার গভীরতা দূর নাও হতে পারে। নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক ডোপ টেস্ট, পরীক্ষার ফল যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং মাদকসংক্রান্ত মামলার আলামত সংরক্ষণে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে জব্দ মাদক কোথায় রাখা হচ্ছে, কারা তা ব্যবস্থাপনা করছে, কখন ধ্বংস করা হচ্ছে এবং প্রতিটি ধাপে নথি কীভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে—এসব বিষয়ে নিরীক্ষাযোগ্য ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

একই সঙ্গে মাদক কারবারে পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখতেন, কোনো অপরাধচক্রকে আগাম তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না, অবৈধ অর্থের লেনদেন হয়েছে কি না এবং আগে কোনো অভিযোগ উপেক্ষা করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। এতে অপরাধের নেটওয়ার্ক শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকলে সেটিও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

ভাটারার বাড়ির মতো ঘটনায় তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদমর্যাদা বা সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক যেন সিদ্ধান্তে প্রভাব না ফেলে, তা নিশ্চিত করা দরকার। বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যেমন প্রমাণ ছাড়া ধরে নেওয়া যাবে না, তেমনি তাঁর পদমর্যাদার কারণে অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়। আয়-ব্যয়ের নথি, অনলাইন বুকিং, ব্যবস্থাপকদের বক্তব্য এবং উদ্ধার করা আলামত মিলিয়ে তদন্তের ফল প্রকাশ করা প্রয়োজন।

মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ তাই শুধু ব্যক্তিগত অসদাচরণের প্রশ্ন নয়; এটি নজরদারি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, তদন্তের স্বাধীনতা এবং জনআস্থার বিষয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুগ শাস্তি, নিয়মিত পরীক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা এবং অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসাজশ উন্মোচন—এই চারটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া মাদকবিরোধী কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতা শক্তিশালী করা কঠিন। মাদক নির্মূলের দায়িত্ব যাদের, তাদের প্রত্যেকের কর্মকাণ্ডও একই আইনি মানদণ্ডে যাচাই করা হচ্ছে—জনগণকে সেই নিশ্চয়তা দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

১

‘ফাদার অব অল বোমস’ উন্মোচনের ঘোষণা ইরানের

২

পূজার দিনে ব্যস্ততা বাড়ে কলকাতার যে মুসলিমদের

৩

‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’: ফ্রান্সের বিক্ষোভে কেন এই স্লোগান

৪

ইউরোপের বিক্ষোভ অভিবাসীদের যে বার্তা দিচ্ছে

৫

ব্যাটিং ব্যর্থতায় আরেকটি পরাজয়ে বিব্রতকর বিদায় বাংলাদেশের

৬

বিষাদের সুরে বিদায় দেবী দুর্গার, উৎসবে মাতল দেশ

৭

আত্মপ্রত্যয়ী জাতি গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা অপরিসীম: প্রধানমন্ত্রী

৮

রাজনৈতিক সহিংসতায় বিপর্যস্ত পরিবার, ঝরে পড়ে সন্তানের পড়াশোনা

৯

সমাজের নিকৃষ্ট লোকেরা এমপি-মন্ত্রী হন: স্পিকার

১০

ইশরাক ‘পোষ্য কোটায়’ রাজনীতিতে এসেছেন: নিলোফার চৌধুরী

১১

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: গ্রেপ্তার পৃথক অভিযোগে, মিশনের চিঠিতে আরও যা আছে

১২

চোখের জলে দেবী দুর্গাকে বিদায় চট্টগ্রামে

১৩

ডিআইজির ট্রিপ্লেক্সে রাতভর ডিজে পার্টি, জনপ্রতি ৬০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি

১৪

রিয়াদে বিমানের ফ্লাইট ২৬ অক্টোবর, চালু দাম্মাম রুটও

১৫

নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে জাতীয় কমিটি গঠনের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

১

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

২

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

৩

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

৪

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

৫

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

৬

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

৭

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

৮

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

৯

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত