ভারতের সঙ্গে নবায়ন আলোচনা অনিশ্চিত, আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার পথও জটিল
বাংলাদেশের আন্তসীমান্ত নদীগুলো দিয়ে আসা পানির প্রায় ৩১ শতাংশ আসে গঙ্গা নদী থেকে। বাংলাদেশে নদীটি পদ্মা নামে পরিচিত। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি সই হয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। এর আগে নতুন চুক্তি সম্পাদন বা কার্যকর কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানিপ্রবাহ ও বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদী, সুন্দরবনের পরিবেশ এবং অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকায়। অথচ চুক্তি নবায়নের আলোচনা কবে শুরু হবে, কী শর্তে সমঝোতা হতে পারে কিংবা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চুক্তি সম্ভব কি না—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট অগ্রগতির চিত্র নেই।
বাংলাদেশের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা ও তার নিশ্চয়তা আদায় করতে হবে, অন্যদিকে সমঝোতা না হলে আন্তর্জাতিক আইনে কী ধরনের প্রতিকার চাওয়া সম্ভব, তা আগেই যাচাই করা প্রয়োজন। তবে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করলেই বাংলাদেশের পক্ষে রায় আসবে কিংবা ভারতকে পানি ছাড়তে বাধ্য করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আদালতের এখতিয়ার, প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি, বিদ্যমান চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত। গত ২৯ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা হবে এবং কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকও চলছে। তবে এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সংসদে দেওয়া এক লিখিত উত্তরে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলোচনা তখনো শুরু হয়নি। ফলে কারিগরি যোগাযোগ চলার কথা বলা হলেও চুক্তি নবায়নের আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও সমঝোতার অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান হলো, শুধু পুরোনো চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো নয়; বরং পানির হিস্যা নিশ্চিত করার মতো সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা ও কার্যকর বাস্তবায়নব্যবস্থা রেখে নতুন বা সংশোধিত চুক্তি করতে হবে। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী এর আগে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো নিশ্চয়তামূলক ধারা চায়। নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পানিপ্রবাহের তথ্য বিনিময় এবং বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তির কার্যকর পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের নীতিনির্ধারণে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গার পানি পশ্চিমবঙ্গের কৃষি, পানীয় জল ও অন্যান্য ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মধ্যে সমন্বয় নতুন চুক্তির আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের সংসদে ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হলেও চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু হয়নি বলে জানানো হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি আলোচনায় কতটা এগিয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ভারতের বিশ্লেষক অমিত রঞ্জন *দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস*-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে গঙ্গা চুক্তি নবায়নকে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি পানির বাস্তব প্রাপ্যতা এবং উজান ও ভাটির দেশের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় বড় চ্যালেঞ্জ। কূটনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি পানিবণ্টনের বাস্তব ও রাজনৈতিক বাধাগুলোর সমাধানও প্রয়োজন।
ভারতের সরকারি পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্সে (আইসিডব্লিউএ) প্রকাশিত অনুষ্কা রূপেনের বিশ্লেষণেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গার পানিপ্রবাহের পুরোনো হিসাব ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরির বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গ ও কেন্দ্রীয় সরকারের সমন্বয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন আলোচনার সুযোগকেও চুক্তি নবায়নের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, নতুন গঙ্গা চুক্তির প্রস্তুতি শুধু কূটনীতিক বা প্রকৌশলীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদেরও এতে যুক্ত করতে হবে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালের পরিস্থিতি আর ২০২৬ সালের বাস্তবতা এক নয়। নতুন চুক্তির ভিত্তি তৈরিতে তথ্য বিনিময় ও বহুমাত্রিক মূল্যায়ন জরুরি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শামীম আহসানও *কাউন্টারপয়েন্ট*-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কার্যকর নতুন কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবিশ্বাস বাড়লে পানিবণ্টনের মতো বিষয়ে সমঝোতা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আলোচনায় আস্থা তৈরি, তথ্য বিনিময় এবং উভয় দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—নতুন চুক্তিতে শুধু পানির পরিমাণ নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। নদীর পরিবেশগত প্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পানিপ্রবাহের নির্ভরযোগ্য তথ্য, যৌথ পর্যবেক্ষণ এবং চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা বা মতবিরোধ দেখা দিলে করণীয়ও স্পষ্ট করতে হবে। এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে চুক্তির মেয়াদ বাড়লেও ভবিষ্যতে অনিশ্চয়তা থেকে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার সুযোগ কতটা
ভারত চুক্তি অনুযায়ী পানি না দিলে বা পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) যাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আদালতের এখতিয়ার। আইসিজে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করে, কিন্তু একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করলেই আদালত স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা শুনতে পারে না। আদালতের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি অথবা কোনো প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক চুক্তি বা অন্য স্বীকৃত আইনি ভিত্তি প্রয়োজন। আইসিজের মামলাসংক্রান্ত নথিতেও রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিকে আদালতের এখতিয়ারের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির সপ্তম অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তি বাস্তবায়ন বা ফারাক্কা ব্যারাজ পরিচালনা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে প্রথমে যৌথ কমিটির মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে সমাধান না হলে সমসংখ্যক বাংলাদেশি ও ভারতীয় বিশেষজ্ঞের প্যানেলে বিষয়টি পাঠানোর বিধান রয়েছে। তাতেও সমাধান না হলে দুই দেশের সরকার পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেবে। তবে চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির শেষ ধাপ হিসেবে আইসিজেতে বাধ্যতামূলকভাবে যাওয়ার কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। পানি কম পাওয়ার অভিযোগ উঠলেই বাংলাদেশ সরাসরি আইসিজেতে গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক রায় আদায় করতে পারবে—এমন নয়। দুই দেশের সম্মতিতে বিরোধ আদালতে পাঠানো সম্ভব হতে পারে। আবার অন্য কোনো প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক চুক্তি বা স্বীকৃত এখতিয়ারের ভিত্তি থাকলে সেই পথও পরীক্ষা করা যেতে পারে। তবে এমন আইনি ভিত্তি বাস্তবে রয়েছে কি না, তা নির্দিষ্ট নথি ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সালিশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারত নতুন চুক্তিতে নির্দিষ্ট বিরোধ সালিশি ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর বিষয়ে একমত হলে তা কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির পথ হতে পারে। কিন্তু একতরফাভাবে কোনো সালিশি প্রক্রিয়া বেছে নিলেই ভারত তাতে অংশ নিতে বাধ্য হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে নতুন চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির ধাপ, সময়সীমা এবং প্রয়োজনে সালিশির বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রাখার দাবি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার পথ সীমিত হলেও আন্তর্জাতিক নদী আইন অপ্রাসঙ্গিক নয়। অভিন্ন নদীর ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহার, অন্য দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না ঘটানোর দায়িত্ব এবং তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতার মতো নীতি এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য। বাংলাদেশ এসব নীতি কূটনৈতিক আলোচনায় তুলে ধরতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইতে পারে। তবে কোন নীতি কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আইনি ভিত্তি, রাষ্ট্রীয় চর্চা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ওপর।
তাই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন দ্বিমুখী প্রস্তুতি। যৌথ নদী কমিশন ও কূটনৈতিক আলোচনায় পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পানিপ্রবাহের নির্ভরযোগ্য তথ্য, চুক্তি বাস্তবায়নের রেকর্ড এবং সম্ভাব্য ক্ষতির প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। আলোচনা ব্যর্থ হলে কোন আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব, সে বিষয়ে আগাম মূল্যায়নও প্রস্তুত রাখা জরুরি।
ফারাক্কা থেকে পদ্মা, গড়াই ও সুন্দরবন
১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহের ভিত্তিতে শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের হিস্যা নির্ধারণের সূত্র রয়েছে। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কায় পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান ভাগ পায়। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে হলে বাংলাদেশ পায় ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ভারত অবশিষ্ট পানি পায়। প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পায় ৪০ হাজার কিউসেক, আর অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ থাকে। ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে তিনটি ১০ দিনের সময়ে উভয় দেশের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তাও চুক্তিতে রয়েছে।
তবে পানিবণ্টনের সূত্র থাকলেই মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া নিশ্চিত হয় না—এমন উদ্বেগ রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বরেন্দ্র এলাকায় কৃষি সেচের সংকট, নদীতে মাছ কমে যাওয়া এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর প্রবাহ হ্রাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদেরা। গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে গেলে পদ্মার পাশাপাশি এর সঙ্গে সংযুক্ত নদ-নদী ও সেচব্যবস্থার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
পরিবেশবাদী সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকনের মতে, গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে গেলে গড়াই নদীর প্রবাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুন্দরবনে মিঠাপানি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গড়াইয়ের ভূমিকা থাকায় এর প্রবাহ হ্রাস উপকূলীয় পরিবেশ ও লবণাক্ততার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের কার্যকারিতা কমে গেলে কৃষির ওপর চাপ বাড়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহানও পর্যাপ্ত নদীর পানি না থাকার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় বন্যার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ফলে নতুন চুক্তিতে শুধু পানির ভাগ নির্ধারণ নয়, নদীর দীর্ঘমেয়াদি প্রবাহ ও পরিবেশগত প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়াও জরুরি।
নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে পানির হিস্যা নিয়ে অস্পষ্টতা কমে এবং চুক্তি বাস্তবায়নে বিরোধ দেখা দিলে দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের পথ থাকে। এ জন্য শুষ্ক মৌসুমে পানির হিস্যার নিশ্চয়তা, প্রবাহ পরিমাপের স্বচ্ছ পদ্ধতি এবং ফারাক্কা ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজসহ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য নিয়মিত বিনিময় ও যৌথভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিপ্রবাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর চুক্তি পর্যালোচনার বিধান রাখা যেতে পারে। যৌথ কমিটি ও যৌথ নদী কমিশনে সমাধান না হলে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনার সময়সীমা নির্ধারণ এবং প্রয়োজনে সালিশির ব্যবস্থা স্পষ্ট করা দরকার। এতে বিরোধ নিষ্পত্তি শুধু দুই দেশের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না থেকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য বিবেচনাযোগ্য হলেও তা তাৎক্ষণিক বা নিশ্চিত সমাধান নয়। আইসিজের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠার মতো আইনি ভিত্তি না থাকলে মামলা গ্রহণেই বাধা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে নতুন চুক্তিতে পানির হিস্যার নিশ্চয়তা, তথ্যের স্বচ্ছতা, যৌথ পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কমানো সম্ভব।
গঙ্গার পানি বাংলাদেশের জন্য শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই ১২ ডিসেম্বরের সময়সীমার আগে আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি, পানির ন্যায্য হিস্যার নিশ্চয়তা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যকর কাঠামো নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি কাজ।
সাড়া নেই ভারতের
চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে চলতি বছরের এপ্রিলে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটির প্রধান করা হয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, পানিসম্পদ সচিব এ কে এম শাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক আতাউর রহমান প্রমুখ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর জন্য গত ৮ জুন ভারতের কাছে চিঠি পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই চিঠিতে বাংলাদেশের গঠিত কারিগরি কমিটির উদ্দেশ্য ও সদস্যদের পরিচয় তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকেও এ ধরনের একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হয়। দুই দেশের কমিটির মাধ্যমে চুক্তি নবায়ন-সংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বয় করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
তবে এ বিষয়ে এখনো ভারতের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি নবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
কমিটির প্রধান ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তি নবায়নের জন্য কারিগরি, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আমরা চুক্তি নবায়নের দায়িত্বসম্পন্ন উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটির সদস্যদের নামের তালিকা পাঠিয়েছি এবং তাদের কাছ থেকেও এমন একটি কমিটির নামের তালিকা আহ্বান করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কোনো ধরনের সাড়া দেয়নি। এ কারণে ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে’।