পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা, দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা; মাতারবাড়ীকে আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব করার পরিকল্পনায় গুরুত্ব বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষায়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফর ঘিরে বাংলাদেশের সামনে খুলেছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা। সফরের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রত্যাশা—আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের এক ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এবং এর মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পাশাপাশি মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে শিল্প, জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তব সুফল পেতে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো ব্যবহারে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারত্বের প্রেক্ষাপটে সফরটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে যৌথ ঘোষণায় থাকা প্রত্যাশাগুলোকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়াই হবে সফরের অর্জন মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান মনে করেন, দুই দেশের যৌথ ঘোষণাটি ভালোভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলোও সফরের প্রস্তুতির প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, সব মিলিয়ে সফরটি প্রশংসনীয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মূল্যায়ন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য যে ধরনের নিশ্চয়তা ও আস্থার প্রয়োজন, সফরটি তার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপ দিতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যান। ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। এ ছাড়া জাপানের বেসরকারি কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেন। সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে ছয়টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর এবং দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা জানানো হয়।
‘বিগ-বি’তে নতুন মাত্রা
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি উদ্যোগকে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগটির নতুন নাম দিয়েছেন ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’—অর্থাৎ অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি। এর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে শিল্প, জ্বালানি ও লজিস্টিকসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে যৌথ ঘোষণায়।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পায়ন নয়; বরং শিল্পের মূল্য সংযোজন, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান জোরদার করা। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনাও এর সঙ্গে যুক্ত।
বিগ-বি বাস্তবায়নে চারটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করা; এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা বাড়ানো।
সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসানের মতে, মাতারবাড়ী-মহেশখালীকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা বিগ-বি উদ্যোগে নতুন গুরুত্ব যোগ করেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টিও আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে জাপানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। বাংলাদেশের কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বাড়াতেও জাপানের সহযোগিতা রয়েছে।
তবে আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার শর্তকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন কামরুল আহসান। তাঁর মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে যোগাযোগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
আঞ্চলিক যোগাযোগে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হবে
অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা নতুন নয়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অনাস্থার কারণে অনেক উদ্যোগই বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারেনি। এ অবস্থায় জাপানের সম্পৃক্ততা সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা মাতারবাড়ী বন্দরের গুরুত্ব আরও বাড়াতে পারে। ভারতের পূর্বাঞ্চলে গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বাংলাদেশের বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু এ সম্ভাবনার সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যয় ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নও জড়িত। লাইলুফার ইয়াসমিনের পরামর্শ, ভবিষ্যতে সড়ক, বন্দর ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে যেসব চুক্তি হবে, সেগুলোতে নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কে বহন করবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহার করে অন্য দেশের পণ্য পরিবহন হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দায়িত্বও চুক্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুফল যেন বাংলাদেশ পায়, একই সঙ্গে দেশের ওপর অসমভাবে ব্যয়ের বোঝা না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; এর আর্থিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা কীভাবে বণ্টিত হবে, সে বিষয়েও আগাম পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
বিনিয়োগের প্রত্যাশা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাত বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারে। এ বিনিয়োগ থেকে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশাও জানানো হয়েছে। তবে এটি ইতিমধ্যে সম্পন্ন বিনিয়োগ নয়; বরং আগামী দিনের বিনিয়োগের পূর্বাভাস। ফলে ঘোষণাটিকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রকল্প নির্বাচন, অর্থায়ন, ব্যবসার পরিবেশ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতের কথা তুলে ধরেছেন—গাড়ি উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, দ্রুতগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ। এসব খাতে বিনিয়োগ এলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান বলেন, উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে জাপানের দীর্ঘদিনের সুনাম রয়েছে। দেশটির বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তা সহায়ক হতে পারে। তবে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ কোন খাতে, কী সময়সীমায় এবং কী ধরনের শর্তে আসবে, তা বাস্তবায়ন পর্যায়েই স্পষ্ট হবে।
অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, চীনের পাশাপাশি জাপানের বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যও বাংলাদেশকে উদ্যোগী হতে হবে। একই সঙ্গে জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, তাঁদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারে প্রবেশের পথ সম্প্রসারণের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কূটনৈতিক অর্জনেও গুরুত্ব
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি জাপানের সমর্থনকে সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছেন কামরুল আহসান। তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে ও টেকসই উপায়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের অবস্থানের মিল রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে জাপানের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে টোকিওর অবস্থান বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এবং গাজা পুনর্গঠনে সমন্বিত পরিকল্পনার বিষয়েও দুই দেশের অবস্থানে মিল রয়েছে বলে মনে করেন এই সাবেক রাষ্ট্রদূত।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের জাপান সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগের সম্ভাবনা, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সমর্থনের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত বিনিয়োগ কতটা বাস্তবায়িত হয়, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সুফল পেতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকে, তার ওপর।