বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে নেমেছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। তাঁর মৃত্যুকে সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড যাচাই, নিখোঁজ মোটরসাইকেলের সন্ধান এবং ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত ও তদন্তের চূড়ান্ত ফল না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি। এর আগের দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনের বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি তিনি।
তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম অভিযোগ করেছেন, তাঁর ছেলেকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘দ্বীপ’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ফোন করে তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নেন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তাহসিফের সঙ্গে থাকা আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ জানিয়েছেন, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁরা তাহসিফের মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য একটি গ্যারেজে যান। পরে উত্তরার রুআপ শপিং কমপ্লেক্সের ‘কুকরুক্কু’ রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খান। সেখান থেকে বেরিয়ে দুজন নিজ নিজ মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন। উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকা পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন। রাত আনুমানিক ১২টার দিকে আলাদা হয়ে যান বলে দাবি করেছেন দ্বীপ।
সিসিটিভি ফুটেজে দ্বীপের সঙ্গে মোটরসাইকেলে তাহসিফের বাসা থেকে বের হওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। তবে রাতের খাবারের পর তাঁদের চলাচল এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত করতে তদন্তকারীরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন।
মধ্যরাতে তাহসিফের মোবাইল ফোন থেকে তাঁর মায়ের ফোনে বাসায় ফিরছেন বলে একটি বার্তা এসেছিল। বার্তাটি কে পাঠিয়েছিলেন, কখন পাঠানো হয়েছিল এবং তখন ফোনটি কার কাছে ছিল—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তাহসিফের মোটরসাইকেলটিরও এখনো সন্ধান মেলেনি। সেটি নদীতে পড়ে আছে, নাকি অন্য কেউ নিয়ে গেছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। প্রয়োজন হলে নদীর আশপাশে তল্লাশি চালানো হতে পারে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল ও সম্ভাব্য যাতায়াতপথের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের পাশাপাশি তাহসিফের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না, সেটিও অনুসন্ধান করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার রেজাউল করিমের ধারণা, এটি হত্যাকাণ্ড হতে পারে এবং ব্যক্তিগত শত্রুতা এর পেছনে কাজ করে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি। নৌ পুলিশকে সহায়তা করার পাশাপাশি তাঁরাও ঘটনাটির খোঁজ নিচ্ছেন।
ঢাকা অঞ্চলের নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মামলা না হলেও ঘটনাটি তদন্তে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু হয়েছে। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তাঁদের দল মাঠে কাজ করছে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, তদন্তকারী সংস্থা নৌ পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে ডিবি প্রস্তুত রয়েছে। নৌ পুলিশ তদন্তের দায়িত্বে থাকলেও ডিবি নিজস্বভাবেও তথ্য সংগ্রহ করছে।
উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে জানান, এ ঘটনায় তখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তাহসিফের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিয়ে থানায় আসতে পারেন বলে তিনি আশা করছেন। মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়াকেও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন তিনি।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ করেছিলেন—এমন পরিচয়ে আলোচনায় এসেছিলেন তাহসিফ। পরে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাঁর মৃত্যুর পর ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। তবে অতীতের এই পরিচয়ের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তদন্তের আগে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এদিকে নৌ পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে মরদেহ উত্তরার বাসায় নেওয়া হয়। পরে স্থানীয় মসজিদে জানাজা শেষে সন্ধ্যায় উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে এখন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, তাঁর শেষ সময়ের চলাচলের তথ্য, মোবাইল ফোনের রেকর্ড এবং নিখোঁজ মোটরসাইকেলের সন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তা পরিষ্কার হওয়ার আশা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।