নিবন্ধন পাঁচ বছরের জন্য, ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা; আবেদন নিষ্পত্তি ৩০ কার্যদিবসে
সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। এতে একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। নিবন্ধন নিতে হলে নির্ধারিত ফরমে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা এবং ফি পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ই-রিকশাকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য পূরণ করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ শীর্ষক বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে। বিধিমালাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ই-রিকশার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি একই সিটি করপোরেশন অথবা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।
আবেদন করবেন যেভাবে
ই-রিকশার নিবন্ধন পেতে আগ্রহী ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে এবং তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। আবেদনে বাংলা ও ইংরেজিতে নাম, বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখ, বয়স, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
আবেদনপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, দুই কপি সত্যায়িত পাসপোর্ট আকারের ছবি, নিবন্ধন ফি জমার রসিদ এবং নির্ধারিত ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে। আবেদনকারীকে ঘোষণা দিতে হবে, আবেদনে দেওয়া সব তথ্য ও দাখিল করা কাগজপত্র সঠিক। পরবর্তী সময়ে কোনো তথ্য বা দলিল মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা ই-রিকশার ধরন, যাত্রী ধারণক্ষমতা, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম, মডেল, চেসিস নম্বর ও মোটর নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্যও দিতে হবে। মালিকের বিমা পলিসি থাকলে তার নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
নিবন্ধন ও ফিটনেস ফি
যাত্রী ধারণক্ষমতার ভিত্তিতে ই-রিকশার নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। চালক ছাড়া দুই যাত্রী বহনে সক্ষম ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা। চার যাত্রী বহনে সক্ষম ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিটি ই-রিকশার ফিটনেস সনদের জন্য দিতে হবে এক হাজার টাকা।
যাচাই-বাছাই ও নিবন্ধনের মেয়াদ
আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর কাগজপত্র যাচাই করবে। একই সঙ্গে ই-রিকশাটি বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য পূরণ করেছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। ফিটনেস সনদ এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না হলে নিবন্ধন বা নবায়ন করা যাবে না।
সব শর্ত পূরণ হলে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রয়েছে। আবেদন নামঞ্জুর হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তার কারণ লিখিতভাবে আবেদনকারীকে জানাতে হবে। সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন। আপিলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। এগুলো যানবাহনের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষে নির্ধারিত ফি দিয়ে নবায়ন করতে হবে। নিবন্ধন বা নবায়ন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না।
গতি, চলাচল ও নিরাপত্তার শর্ত
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ গতি রাখতে হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে। যানবাহন চলাচল করতে হবে সড়কের বাম লেন দিয়ে। জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডোর এবং নিষিদ্ধ সড়কে ই-রিকশা চালানো যাবে না।
ই-রিকশার আকার ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন নিষিদ্ধ। হর্নের শব্দের তীব্রতা ৪০ ডেসিবেলের বেশি হতে পারবে না। যানবাহনে স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিযুক্ত এবং অনিবন্ধিত ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।
বিধিমালায় প্রতিটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়সীমা শেষ হলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নিবন্ধন ও নম্বর প্লেট বাতিল করতে হবে। বর্তমানে চলাচলরত ই-রিকশাকেও নিবন্ধন পেতে বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
চার্জিং ও চালকের দায়িত্ব
ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে হবে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্ধারিত গ্যারেজে। এসব স্থানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। পুরোনো ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলা, মাটি বা পানিতে মেশানো, সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলা কিংবা পুড়িয়ে ফেলা যাবে না। ব্যাটারি বিক্রেতাদের পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে লাইসেন্সপ্রাপ্ত পুনর্ব্যবহারকারীর কাছে পাঠাতে হবে।
বিধিমালায় অনুমোদিত সীমার বেশি গতিতে চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার, মোটর বা কাঠামোতে অননুমোদিত পরিবর্তন এবং নিষিদ্ধ সড়কে চলাচলসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিপজ্জনকভাবে যান চালানো কিংবা দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়াও দণ্ডনীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে, আহত ব্যক্তিকে সহায়তা করতে হবে এবং পুলিশকে জানাতে হবে।
নতুন বিধিমালার মাধ্যমে নিবন্ধন, প্রযুক্তিগত মান, ফিটনেস, চলাচলের সীমা ও চালকের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।