লাঞ্চের আগে মেহেদী হাসান মিরাজের এক ওভারে তিনবার জোরালো আবেদনে আশার আলো দেখেছিল বাংলাদেশ। মনে হচ্ছিল, বিরতির পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানদের কঠিন পরীক্ষা নিতে পারবেন স্বাগতিক স্পিনাররা। কিন্তু লাঞ্চের পর দৃশ্যপট বদলে গেল দ্রুত। দুই ক্যারিবীয় ওপেনারের ব্যাটিংয়ের সামনে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ল বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণ। শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ার আগেই ৮ উইকেটের বড় জয় তুলে নিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
শুধু জয় নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে উড়িয়ে দেওয়ার আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামার কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশ। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দৌড়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ঘরের মাঠে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সিরিজটি ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিপক্ষকে চাপে রেখে একের পর এক জয় তুলে নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল দলের। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা গেল না। বরং নিজেদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পনার ঘাটতি আর ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিয়ে বড়সড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ।
ব্যাটিং কিংবা বোলিং—কোনো বিভাগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে পেরে ওঠেনি স্বাগতিকরা। ব্যাট হাতে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে পারেনি বাংলাদেশের ব্যাটাররা। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে দলকে বারবার বিপদে ফেলেছেন তারা। অন্যদিকে, বোলিংয়েও প্রতিপক্ষের ওপর প্রত্যাশিত চাপ তৈরি করতে পারেনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যেই বাংলাদেশের বোলিং সামলে নিজেদের কাজটা করে গেছেন।
মিরপুর টেস্টের চতুর্থ দিনে জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের লক্ষ্য ছিল ১৭০ রান। আগের দিন ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান কঠিন করে ফেলেছিল। চতুর্থ দিনে নাঈম হাসানের লড়াকু ফিফটিতে লক্ষ্যটা কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনে হলেও ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা তা সহজেই পেরিয়ে যান। ৩৫.১ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে ১৭০ রান তুলে জয় নিশ্চিত করে তারা। দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল সফরকারীরা।
বৃষ্টি ও আলোকস্বল্পতার কারণে ম্যাচের প্রথম তিন দিনে ৬০ ওভারের বেশি খেলা সম্ভব হয়নি। চতুর্থ দিনেও কয়েক দফা খেলা বন্ধ থাকলেও নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই শেষ হয়ে যায় ম্যাচ।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ে বড় অবদান দুই ওপেনার জন ক্যাম্পবেল ও ব্র্যান্ডন কিংয়ের। প্রথম উইকেটে ১১২ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশের জয়ের আশা কার্যত শেষ করে দেন তাঁরা। ক্যাম্পবেল ৪৯ রান করে শরিফুল ইসলামের বলে বোল্ড হলে ভাঙে জুটি। এরপর তেজনারাইন চান্দারপলকে ফিরিয়ে দেন হাসান মাহমুদ। তবে ততক্ষণে জয়ের পথ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে ক্যারিবীয়দের। কিং ১১৫ বলে ৮১ রানে অপরাজিত থাকেন। তাঁর ইনিংসে ছিল আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ের ছাপ। অন্য প্রান্তে কাভেম হজ ২৭ বলে অপরাজিত ৩১ রান করে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন।
শুরুতে মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের স্পিনে কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন দুই ওপেনার। তবে ধারাবাহিক চাপ ধরে রাখতে পারেননি বাংলাদেশের বোলাররা। ভালো বলের পাশাপাশি আলগা ডেলিভারি দেওয়ায় ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা। ১৮ ওভার পর প্রথমবার পেস আক্রমণে আনা হয় শরিফুলকে। তাঁর দ্বিতীয় ওভারে ক্যাম্পবেল ফিরলেও ততক্ষণে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতে।
বাংলাদেশের স্পিনারদের মধ্যে সবচেয়ে হতাশ করেছেন তাইজুল ইসলাম। ১২.১ ওভারে ৫৪ রান দিয়েও কোনো উইকেট পাননি তিনি। মিরাজ ৫ ওভারে ২৬ রান এবং নাঈম হাসান ১১ ওভারে ৪৯ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকেন। অন্যদিকে পেসার শরিফুল ও হাসান একটি করে উইকেট নেন।
এর আগে সকালে ৬ উইকেটে ৭৯ রান নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে বাংলাদেশ। দিনের প্রথম ওভারেই বিদায় নেন জাকের আলী। জোমেল ওয়ারিক্যানের বলে বাউন্ডারি মারার পরের বলেই স্লিপে ক্যাচ দেন তিনি। তাঁর বিদায়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয় আরও গভীর হয়।
এরপর একপ্রান্ত আগলে লড়াই চালিয়ে যান নাঈম। হাসান মাহমুদ কিছু সময় তাঁকে সঙ্গ দিলেও ওয়ারিক্যানের আর্ম বলে ফিরতে হয় তাঁকে। তাইজুল ইসলাম রিভার্স সুইপে চার মারলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। শেষ দিকে শরিফুল ইসলামকে নিয়ে নাঈম তুলে নেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি। তবে পঞ্চাশের পরপরই ছক্কা মারতে গিয়ে আউট হন তিনি। বাংলাদেশ থামে ১৪২ রানে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৭০।
নাঈমের ৫২ রানের ইনিংসের পাশাপাশি বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে জাকের আলী করেন ২২ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ রান দিয়ে ৫ উইকেট নেন অধিনায়ক রস্টন চেইস। প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়া ওয়ারিক্যান দ্বিতীয় ইনিংসে শিকার করেন চার উইকেট। ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে তাঁর কার্যকর বোলিংয়ের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান করেছিল। জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ২৪৫ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট আগামী বৃহস্পতিবার সিলেটে শুরু হবে। প্রথম টেস্টে হারের পর সিরিজে সমতা ফেরাতে হলে বাংলাদেশকে ব্যাটিং ও স্পিন—দুই বিভাগেই ঘুরে দাঁড়াতে হবে।