পদত্যাগের দাবিতে রাতভর বিক্ষোভ | অনুষ্ঠান দেরিতে শেষ হওয়া নিয়ে দুই ছাত্রীর আবাসিক আসন বাতিল ও ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানার বিরোধ থেকে আন্দোলন
রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের (সাবেক হোম ইকোনমিকস কলেজ) অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছাকে প্রায় ১২ ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখার পর উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কলেজে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় এক ছাত্রীকে চুল ধরে টেনে-হিঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে রাতভর কলেজের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে কলেজের প্রশাসনিক ভবনে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ছাত্রীরা। দিনভর তাঁরা অধ্যক্ষকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ে। পুলিশ অধ্যক্ষকে উদ্ধার করতে গেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের। পরে রাতেও শতাধিক ছাত্রীকে কলেজের সামনের সড়কে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়।
আন্দোলনকারীরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগ দাবি করছেন। বিক্ষোভের সময় ‘দফা এক দাবি এক, প্রিন্সিপালের পদত্যাগ’ এবং ‘প্রিন্সিপালের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তাঁরা।
আন্দোলনের সূত্রপাত পূজার ছুটির আগে কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত একটি বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রথমে রাত ১০টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান শেষ হয় পরদিন ভোর ৫টার দিকে।
নির্ধারিত সময়ের পরও অডিটোরিয়াম ব্যবহার করায় অনুষ্ঠানটির সমন্বয়কারী দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ। পরে ওই দুই শিক্ষার্থী ক্ষমা চাইতে গেলে আসন ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত হিসেবে অডিটোরিয়ামের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ এক রাতের জন্য ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এই সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক ও শাস্তিমূলক উল্লেখ করে তাঁরা প্রতিবাদ শুরু করেন। পরে অধ্যক্ষের পদত্যাগসহ আরও কয়েকটি দাবিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
কলেজের স্নাতকোত্তরের প্রথম পর্বের শিক্ষার্থী তাবাসসুম সাংবাদিকদের বলেন, দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক আসন অযৌক্তিকভাবে বাতিল করায় তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেন। তবে শাস্তি হিসেবে এক রাতের অডিটোরিয়ামের বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা দিতে বলেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষে এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়।
অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেসা অবশ্য শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, রাত ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ভোর ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চালিয়েছেন। এ কারণে রাগের মাথায় দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক আসন বাতিল করেছিলেন। পরে তাঁরা ক্ষমা চাইলে তিনি নমনীয় হন। তবে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শাস্তির আওতায় আসতে হবে এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিল তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
পদত্যাগের দাবির বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষার্থীরা তাঁকে সাদা কাগজে পদত্যাগের স্বাক্ষর দিতে বলছেন। তাঁদের কাছে কেন পদত্যাগ করবেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এদিকে লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামিল হোসেন জানান, অধ্যক্ষকে অপসারণের দাবিতে সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা তাঁকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। একপর্যায়ে অধ্যক্ষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানায়। পরে রাত ১১টার দিকে পুলিশ কলেজে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। তাঁর ভাষ্য, অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের পরও চলায় দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং কলেজের ক্যান্টিনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের অপসারণ দাবি করছিলেন।
তবে অধ্যক্ষকে উদ্ধারের সময় পুলিশের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে চুল ধরে টেনে-হিঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জও করেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাত ২টা ১০ মিনিটে সংবাদ সম্মেলন করে রাতের মতো কর্মসূচি শেষ করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের পক্ষে তামান্না ইসলাম জানান, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে আবার আন্দোলন শুরু হবে। তবে শুক্রবারের নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালে কর্মসূচি স্থগিত থাকবে। পরীক্ষা শেষ হলে আবার আন্দোলন শুরু করবেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে—অধ্যক্ষের পদত্যাগের লিখিত ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত কলেজের সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা, শুক্রবার ক্যাম্পাসে সরকারি কোনো পরীক্ষা না নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের শোকজ করা। এ ছাড়া হামলাকে বৈধতা দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
একটি অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি চলা, দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক আসন বাতিল এবং বিদ্যুৎ ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণের বিল আদায়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত অধ্যক্ষকে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ রাখা, পুলিশি উদ্ধার অভিযান এবং রাতভর বিক্ষোভে গড়িয়েছে। এখন শিক্ষার্থীদের মূল দাবি অধ্যক্ষের পদত্যাগ। অন্যদিকে অধ্যক্ষ নিজের সিদ্ধান্তকে কলেজের শৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। ফলে বিরোধের নিষ্পত্তিতে কলেজ কর্তৃপক্ষের অবস্থানের পাশাপাশি পুলিশি অভিযানে শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।