পতিত ও নব্য স্বৈরাচার—দুই শক্তিকে পরাজিত করার ঘোষণা; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে প্রার্থী ঘোষণা
রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভ সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটলেও দেশে নতুন করে স্বৈরাচারী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর দাবি, গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নতুন করে ভারতকে করিডোর দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোনোভাবেই এমন উদ্যোগ মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা দাবিতে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচার ও নব্য স্বৈরাচার—দুই শক্তিকেই পরাজিত করা হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ করার চেষ্টা চলছে। আগামী ডিসেম্বরে পতিত স্বৈরাচার দেশে ফিরতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সেই শক্তিকে মোকাবিলা করতে পারবে না। তাঁর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৬ বছরেও জনগণকে রক্ষা করতে পারেনি। বিএনপিও অতীতে আওয়ামী লীগের হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে; এমনকি নিজেদের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারেনি।
সরকারের সমালোচনা করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, গত এক সপ্তাহে দলের নেতারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। এসব আলোচনায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট, বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির কারণে মানুষের দুর্ভোগের চিত্র উঠে এসেছে। দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশ পরিচালনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনার পরিবর্তে বিএনপির কর্মকাণ্ডে দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্বের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব পরিকল্পনা নিয়েই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিএনপি নির্বাচনের প্রথম দিন থেকেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে দাবি করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংস্কারের জন্য গঠিত একতরফা কমিটি বাতিল করে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান তিনি।
নাহিদ ইসলামের দাবি, জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। সেই রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পদত্যাগ দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে নিজ নিজ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় নিয়ে জ্বালানিমন্ত্রীরও পদত্যাগ দাবি করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, এ ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর বর্তায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তিনি সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের সীমান্তে হত্যা, পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টি এবং ভারতের বিভিন্ন এলাকায় মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। এ প্রসঙ্গে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের নির্যাতন এবং দিল্লিতে মসজিদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে ঘিরেও ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
সমাবেশে ঢাকা মহানগরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের দুই নেতার অংশগ্রহণের ঘোষণাও দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ নির্বাচনে অংশ নেবেন।
ঢাকাবাসীর উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, নগরবাসী সন্ত্রাস, দখলদারত্ব ও নানা ধরনের নৈরাজ্যের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে এনসিপি দুই নেতাকে সামনে নিয়ে আসছে। নির্বাচনে তাঁরা জয়ী হলে নগরবাসীর সমস্যা সমাধানে কাজ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আগেরবার পরাজিত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। এবার তাঁকে হারতে দেওয়া হবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদকে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনের বাইরে রাখার মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিকে নিঃশেষ করার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ ধরনের প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পরাজিত হবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে ঢাকাবাসীর অধিকার ও দাবি আদায়ে এনসিপি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং গণ-অভ্যুত্থানের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবেন বলে জানান নাহিদ ইসলাম। তরুণসমাজ ও গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মুজিববাদী ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং দুর্নীতিবাজ মাফিয়া সরকারের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেনও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর দেশ পরিস্থিতির উন্নতি তো দূরের কথা, বিএনপি নিজেরাই নিজেদের অবস্থান ঠিক করতে পারেনি।
গ্যাসের মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে আখতার হোসেন বলেন, কলকাতায় এক হাজার টাকায় গ্যাস পাওয়া গেলে বাংলাদেশে কেন আড়াই হাজার টাকা দিতে হবে? তাঁর অভিযোগ, গণতন্ত্রের যাত্রায় বিএনপি উল্টো পথে হাঁটছে এবং সব খাতেই সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন তিনি।
সমাবেশে বক্তারা সরকারের নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন এনসিপির নেতারা।