নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও মন্ত্রীদের পদত্যাগসহ নানা দাবিতে আন্দোলনের পরিকল্পনা;
সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে নভেম্বরের শুরু থেকেই রাজপথে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন জোরদার করতে চায় দল দুটি। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে অভিযোগ ও অসন্তোষ তাদের এই অবস্থানকে আরও কঠোর করেছে বলে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তবে আন্দোলনের ধরন ও কর্মসূচি নিয়ে দুই দলের মধ্যে এখনো আলোচনা চলছে। তারা যৌথ ব্যানারে মাঠে নামবে, নাকি পৃথক কর্মসূচি নিয়ে একই দাবিতে আন্দোলন চালাবে, তা চূড়ান্ত হয়নি। একই সঙ্গে এনসিপির সাংগঠনিক অবস্থান, জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয় এবং দলটির ভেতরে মতপার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দুই দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমাবেশ ও লংমার্চের মতো কর্মসূচির পর আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ নিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিকে সামনে রেখে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই চাপ বাড়ানোর কথা ভাবছে তারা। তবে পৃথক কর্মসূচি হলেও দাবির বিষয়ে সমন্বয় রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির ১৯৫ সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর দলটির ভেতরে নেতৃত্ব ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। নোয়াখালীর সুবর্ণচরসহ বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পটভূমির নেতাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও দলের ভেতরে মতপার্থক্যের কথা সামনে এসেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পাশাপাশি নিজেদের সাংগঠনিক দূরত্ব কমানোও দুই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এ উদ্দেশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে দলটির প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের ওপর নির্যাতন এবং ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য, আন্দোলন কেবল একটি উপনির্বাচনের প্রতিবাদ নয়; বরং পুরো নির্বাচনী ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও প্রশাসনে পরিবর্তনের দাবিতে কঠোর কর্মসূচির দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, এনসিপির পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির এক শীর্ষ নেতা বলেন, ২৩ অক্টোবরের কমিটি নিয়ে দলের ভেতরে যে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে। তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমির নেতাদের অন্তর্ভুক্তিকে তিনি মাঠের বাস্তবতা ও কৌশলগত প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর দাবি, সরকারের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের দাবিতে দলটি অনড় থাকবে বলেও জানান তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিরোধী দল এখনো হরতাল বা অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি দেয়নি। তবে জনগণের দাবি আদায় ও অধিকার রক্ষার প্রয়োজনে যেকোনো সময় এমন কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। তিনি দ্রুত নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নিরপেক্ষভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিদ্যুৎমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। পাশাপাশি পুলিশপ্রধানের বিতর্কিত মন্তব্যের পর তাঁর অপসারণও দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকারের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তাঁর ভাষ্য, সরকার একের পর এক অনিয়ম করবে আর বিরোধীরা নীরব থাকবে—এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না। সংবিধানের সীমিত সংশোধনের পরিবর্তে আমূল পরিবর্তনের পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছে দাবি করে তিনি অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আহ্বান জানান। অন্যথায় আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এদিকে, আন্দোলনের প্রস্তুতির বিপরীতে সরকার ও প্রশাসনের অবস্থান নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। সরকারের পক্ষের এক নেতা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। তবে আন্দোলনের নামে সহিংসতা, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা কিংবা ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন নিয়মতান্ত্রিক হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই জামায়াত অভিযোগ তুলছে। প্রশাসনকে কোনো দলের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করা হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসকদের কাছে গোপন নির্দেশনা পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। ওই নির্দেশনায় কয়েকটি জেলায় ‘নাগরিক কমিটি’ বা সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে মাঠপর্যায়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনার কথাও বলা হয়েছে। তবে নির্দেশনার কপি, তারিখ ও নির্দিষ্ট বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চের রুট পরিবর্তনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দলীয় সূত্রের দাবি, প্রশাসনিক নজরদারি এড়ানো ও জনসমাগম নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবে বিকল্প পথ ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে মূল রুটের পরিবর্তন, বিকল্প পথের বিবরণ এবং এ সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাইফুল আলমের মতে, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে সমন্বয় মূলত কৌশলগত; আদর্শিক ঐক্য নয়। এনসিপি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উদারপন্থী ও তরুণ নেতৃত্বের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে চাইলেও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দলটির ভেতরে নতুন মতপার্থক্য তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, আন্দোলনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে সেই দূরত্ব আড়াল করা সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা এনসিপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এনসিপির ভেতরের একটি অংশ মনে করে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের কর্মসূচিতে নিঃশর্তভাবে অংশ নিলে দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে একই দাবিতে আন্দোলন করলেও দুই দলের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় কতটা গভীর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সব মিলিয়ে নভেম্বরের শুরুতে জামায়াত ও এনসিপির আন্দোলন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। তবে কর্মসূচির চূড়ান্ত রূপরেখা, দুই দলের সাংগঠনিক সমন্বয়ের মাত্রা এবং সরকারের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া—এসব বিষয় এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনের ভূমিকা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ দেশের রাজনীতির গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।