রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাকসুর গঠনতন্ত্রে এক বছরে দুইবার অডিট করার বিধান থাকলেও নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধিদের এই ফোরামের প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো অডিট হয়নি। ফলে রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি রাকসুর নেতাদের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থের বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে অডিট হলে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতো।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাকসুর নেতারা এক কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা উত্তোলন করলেও এর মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকা খরচের বিল-ভাউচার জমা দেননি। বিষয়টিকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ হিসেবে তুলে রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। পরদিন সংগঠনটির পক্ষ থেকে ঘটনাটি ব্যঙ্গ করে ‘ভাউচার মেলা’ও আয়োজন করা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী পরিচালিত দেশের স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। ওই অধ্যাদেশের ১২তম অধ্যায়ে রাকসু-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধান রয়েছে। এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ছাত্র সংসদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এক বছরের মেয়াদে দুইবার রাকসুর যাবতীয় কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি অডিট বোর্ড গঠনের কথা বলা হয়েছে।
এই অডিট বোর্ডে রাকসুর সভাপতি তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনোনীত দুজন শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ থাকার কথা। রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) অডিট বোর্ডের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তিনি বোর্ডের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন না। কিন্তু সর্বশেষ রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও অডিট বোর্ডের মাধ্যমে কোনো অডিট হয়নি।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, অডিট না হওয়ার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ নেই। তবে রাকসুর মেয়াদ শেষে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংসদের কার্যক্রম নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী একটি অডিট টিমের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হবে বলে তিনি জানান।
রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, গঠনতন্ত্রে বছরে দুইবার অডিটের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন রাকসু বন্ধ থাকায় নতুন করে কার্যক্রম শুরু করতে সময় লেগেছে। বাজেট পেতেও প্রায় ছয় মাস সময় চলে যায়। ফলে প্রথম ছয় মাসে রাকসুর কার্যক্রম সেভাবে শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী ছয় মাসে কার্যক্রম শুরু হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে অডিট করা সম্ভব হয়নি।
রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, অডিটের বিষয়ে বারবার কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। তারা বছর শেষে অডিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জেনেছি। তবে আমাদের ক্ষেত্রেও কিছু বাস্তব সমস্যা ছিল। আমরা মূলত জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছি। এ কারণে অডিটসহ কিছু কার্যক্রম সময়মত করা সম্ভব হয়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ইতিহাস দীর্ঘ। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর ১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন—রাসু নামে প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরের বছর একই নামে আরেকটি নির্বাচন হয়। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা রাকসু নাম চালু হয়। এখন পর্যন্ত ১৫ বার নির্বাচন হয়েছে। সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর ১৭তম রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। নির্ধারিত সময়ে অডিট না হওয়ায় রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা।
গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মুখপাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, রাকসুর সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় রাখতে পারেননি। একই সঙ্গে বছরে দুইবার অডিটের বিধানও বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে ভাউচার-সংক্রান্ত অনিয়মের দায় রাকসুর এই দুই কর্মকর্তার ওপরও বর্তায় বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, নিয়মিত অডিটের হিসাব প্রকাশ ও উপস্থাপন না করা হলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এরই মধ্যে অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতির অভিযোগও সামনে এসেছে। তাই রাকসুর অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বর্তমান কোষাধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ছাত্র অধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, নিয়মিতভাবে ছয় মাস পর পর অডিট করা হলে বর্তমানে ভাউচার নিয়ে যে প্রশ্ন ও সংকট তৈরি হয়েছে, তা হয়তো এতটা বড় আকার ধারণ করত না। অডিট না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে।
রাকসুর গঠনতন্ত্রে নির্ধারিত অডিট ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ার মধ্যেই বিপুল অঙ্কের অর্থের বিল-ভাউচার নিয়ে অভিযোগ সামনে আসায় এখন নিয়মিত অডিটের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাকসুর আর্থিক কর্মকাণ্ডে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিরপেক্ষ অডিট এবং সেই হিসাব প্রকাশ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সূত্র: বিডিনিউজ