পর্যটন নগরী কক্সবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিনিয়ত ঘটছে জোড়া খুনের মতো চাঞ্চল্যকর অপরাধ। সেই সাথে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরণের মাদক পাচার ও আটক করার ঘটনা ব্যাপক হারে বেড়েছে।
এতে করে সাধারণ বাসিন্দা ও পর্যটকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
কক্সবাজারে গড়ে প্রতি মাসে ১৩ জনের বেশি মানুষ খু ন হচ্ছেন। জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে জেলায় ৮৮টি খু নের ঘটনা ঘটেছে। হিসাব অনুযায়ী, মাসে গড়ে ১২ দশমিক ৬ জন, অর্থাৎ প্রায় প্রতি আড়াই দিনে একজন খু ন হয়েছেন। খুনের পাশাপাশি ধর্ষণ, অপহরণ, ছিনতাই, চুরি ও ডাকা তির ঘটনাও ঘটছে। একই সময়ে জেলায় ১২৭টি ধ র্ষ ণ এবং ২৯৭টি অপ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নি র্যা তন আইনে মামলা হয়েছে ১৫০টির বেশি।
গত ২৭ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) রাতে কক্সবাজারের ঝাউতলা এলাকার রেনেসাঁ হোটেলের বারে মদ্যপান ও কথা-কাটাকাটির জেরে কয়েকজন যুবকের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। বিরোধের একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র ও কাচের ভাঙা বোতল দিয়ে আঘাত করা হলে নাজিবুল হক রাশেদ (২৯) নামের এক ব্যবসায়ী গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যাওয়ার সময় হামলাকারীদের মধ্যে সোলাইমান ওরফে সালমান নামের একজনকে স্থানীয়রা ও নিহতের স্বজনরা ধরে গণপিটুনি দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
শহরের কলাতলী সুগন্ধা পয়েন্ট, ল্যাবরেটরি স্কুল সড়ক, বিচ রোড এবং শহরের বাইপাস এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র। পর্যটক ও স্থানীয় পথচারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান সামগ্রী লুটে নেওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এছাড়া শহরতলি ও উখিয়া -টেকনাফের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে রাতের আঁধারে ডাকাতির ঘটনাও বেড়েছে।
সীমান্ত এলাকা টেকনাফ ও উখিয়া হয়ে ইয়াবা পাচারের তৎপরতা আবারো বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ পিস ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকসহ পাচারকারীরা আটক হলেও এর মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে। নাফ নদী ও মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবহার করে নতুন কৌশল অবলম্বন করছে পাচারকারী চক্রগুলো।
অপরদিকে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সম্প্রতি হত্যা, অপহরণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবিক কারণে আশ্রয় পাওয়া এই শরণার্থী শিবিরগুলোর নিরাপত্তা ও দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি একটি জটিল নিরাপত্তা হুমকিতে রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবী রোহিঙ্গাদের অবনতির মূল কারণ হলো আরসা (ARSA) ও আরএসও (RSO)-র মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রতিযোগিতা। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, আইস ও অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান এই অপরাধ চক্রকে অর্থের জোগান দিচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা প্রতিনিয়ত সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এছাড়া সাধারণ রোহিঙ্গা প্রতিনিধি (মাঝি) ও স্বেচ্ছাসেবকদের ধারাবাহিকভাবে হত্যা করা হচ্ছে যাতে ক্যাম্পে কোনো সুশাসন বা শৃঙ্খলা গড়ে না ওঠে। এই পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, যেখানে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের প্রভাবে সীমান্তে অপরাধের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ চিরুনি অভিযান, ড্রোন ও প্রযুক্তির সাহায্যে সীমান্ত নজরদারি বৃদ্ধি, ক্যাম্পের ভেতর সিসিটিভি ও নিরাপত্তা চৌকি জোরদার করা এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি।
কক্সবাজারের সুশীল সমাজ ও সাধারণ বাসিন্দারা দ্রুত অপরাধীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পর্যটন মৌসুম ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শহরের সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে পুলিশি টহল জোরদার এবং চেকপোস্ট বসানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যৌথ অভিযান ও বিশেষ তল্লাশি জোরদার করা হচ্ছে। অপরাধের সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।