পাবনার দোগাছী ইউনিয়নের কুলোনিয়া গ্রামে ১০ বছরের শিশু কামরুন্নাহার কলিকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত মোস্তফা কামালের দোতলা বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর এবার সেখানকার মাটিও তুলে নিয়ে যাচ্ছেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। বাড়িটির ইট, বালু ও নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মাটির নিচের ভিত্তির রডও কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে মামলার তদন্তের অগ্রগতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহত শিশুটির স্বজনেরা।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর বাড়িটি ভাঙার কাজ শুরু হয়। গত শনিবার, ২৪ অক্টোবর পর্যন্তও সেখানে ভাঙা ও মাটি সরানোর কাজ চলছিল। সোমবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা বাড়িটির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরো জায়গাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাটির নিচে থাকা ভিত্তির রড পর্যন্ত কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইট ও বালু গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকেরা।
বাড়ির মাটি সরানোর কাজে যুক্ত সলিম প্রামাণিক বলেন, মোস্তফা যে অপরাধ করেছে, তার শাস্তি হিসেবে তাঁর বাড়িটি রাখা হয়নি। এখন বাড়ির মাটি তুলে রাস্তা নির্মাণ ও নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে পুকুর তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাড়ি ভাঙার কাজে অংশ নেওয়া আতাইকুলার মাধপুর এলাকার রুবেল হাসান বলেন, মোস্তফা কামালের বাড়ির কোনো চিহ্ন রাখা হবে না। ইট তো দূরের কথা, একমুঠো বালুও সেখানে থাকবে না। জায়গাটিতে পুকুর তৈরি করা হবে। তাঁর ভাষ্য, ধর্ষণের মতো অপরাধের পরিণতি বোঝাতে জায়গাটি একটি নিদর্শন হয়ে থাকবে।
এদিকে অভিযুক্তের বাড়ি ভাঙার কাজ প্রায় শেষ হলেও মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত শিশুটির স্বজনেরা। তাঁদের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে হবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুটির দাদা আব্দুস সোবহান বলেন, এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। এত দিনে তা জমা পড়া উচিত ছিল। এ নিয়ে প্রশাসনের গাফিলতি রয়েছে বলে তাঁর মনে হচ্ছে। তিনি দ্রুত তদন্ত শেষ করে মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।
শিশুটির আরেক স্বজন রমজান আলী বলেন, দোতলা বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে, এমনকি বাড়ির কোনো চিহ্নও নেই। অথচ মামলার কাগজপত্রের কাজ এখনো শেষ হয়নি বলে তাঁরা শুনছেন। তাঁর দাবি, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া যেন অর্থের বিনিময়ে প্রভাবিত না হয়, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
এ বিষয়ে পাবনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন, মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। ফরেনসিক প্রতিবেদন হাসপাতালে এসেছে। দ্রুতই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি। সাত দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে কুলোনিয়া গ্রামে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় তার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় প্রতিবেশী মোস্তফা কামাল ও তাঁর ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর মাগরিবের পর মোস্তফার দোকানের পেছনের একটি কক্ষে শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ বস্তাবন্দী করে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশ আরও জানায়, ঘটনা আড়াল করতে অভিযুক্তরা নিজেরাই শিশুটিকে খোঁজার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে মোস্তফা ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ইয়াছিন ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে হত্যার পর সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। মামলার আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ডিবি জানিয়েছে, তদন্তের অগ্রগতি ও ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর দ্রুত অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে।