লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে বন্য প্রাণীর আক্রমণে তিনজন আহত হওয়ার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফাঁকা গুলি ছুড়ে বাঘটিকে লোকালয় থেকে সরিয়ে দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধার করতে বন বিভাগ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) যৌথভাবে কাজ করছে। এরই মধ্যে থার্মাল ক্যামেরা ও ড্রোনের সাহায্যে প্রাণীটির অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়েছে। তবে সোমবার সকাল পর্যন্ত সেটিকে আটক করা সম্ভব হয়নি। বন বিভাগের প্রাথমিক ধারণা, প্রাণীটি বাঘ নয়, চিতাবাঘও হতে পারে। প্রজাতি নিশ্চিত করতে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও অনুসন্ধান চলছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেল পাঁচটার দিকে হাতীবান্ধা উপজেলার উত্তর আমঝোল সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিরা হলেন আমঝোল গ্রামের শহিদার রহমানের স্ত্রী শরিফা বেগম (৩০), আফসার হোসেন ও নজরুল ইসলাম। তাঁদের মধ্যে দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অপরজন হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন (১৫ বিজিবি) জানায়, ব্যাটালিয়নের অধীন বনচৌকি বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত পিলার ৯০৫/১১-এস থেকে প্রায় ১০০ গজ বাংলাদেশের ভেতরে এ ঘটনা ঘটে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, হারিয়ে যাওয়া ছাগল খুঁজতে ধানক্ষেতের পাশে গিয়েছিলেন শরিফা বেগম। এ সময় বন্য প্রাণীটি তাঁকে আক্রমণ করে। তাঁর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন উদ্ধারে এগিয়ে এলে আরও দুজন আহত হন। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
খবর পেয়ে বিজিবির টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জনসাধারণের নিরাপত্তার স্বার্থে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে প্রাণীটি ঘটনাস্থল ছেড়ে পাশের জঙ্গলের দিকে চলে যায়। তবে সেটি কোথায় অবস্থান করছে, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
ঘটনার পর লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধার এবং পুনরায় লোকালয়ে প্রবেশের ঝুঁকি কমাতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বন বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়।
সোমবার প্রাণীটির অবস্থান শনাক্ত করতে ড্রোন ও থার্মাল ক্যামেরা ব্যবহার করে বিজিবি। রাতেও সীমান্তবর্তী এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হয়। তবে সোমবার সকাল ১১টা পর্যন্ত প্রাণীটিকে আটক করা যায়নি। বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ দলের চার সদস্যসহ লালমনিরহাট, হাতীবান্ধা ও রংপুরের ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘটনাস্থলে কাজ করছিলেন। তাঁরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছিলেন।
লালমনিরহাট জেলা সামাজিক বনায়ন, নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আক্রান্ত ছাগলের শরীরে আঘাতের ধরন ও গভীরতা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রাণীটিকে চিতাবাঘ বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের কাজ চলছে।
আমঝোল সীমান্তের এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তা-উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ধানক্ষেত, ঝোপঝাড় ও সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় কাজ করা মানুষেরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। প্রাণীটি আশপাশে অবস্থান করলে নতুন করে হামলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের সতর্ক থাকা, একা ঝোপঝাড় বা ঘন গাছপালার মধ্যে না যাওয়া এবং প্রাণীটিকে দেখতে পেলে কাছে যাওয়ার চেষ্টা না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নিজ উদ্যোগে প্রাণীটিকে ধাওয়া করা, ঘিরে ফেলা কিংবা ধরার চেষ্টা করলে মানুষ ও বন্য প্রাণী—উভয়েরই ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
বিজিবি জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধার এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলছে।