দিল্লিতে বিরোধীদের বিক্ষোভ, ধরপাকড় ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক; ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে উত্তেজনা
বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ধরপাকড় ও বিরোধীদের প্রতিবাদের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, ভারত ‘গণতন্ত্রের জননী’। দেশটির গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের বিস্তার ও ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রশংসা করে দেওয়া তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বক্তব্য দেন মোদী। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে তাঁর এই বক্তব্য আসে। ফোরামে তিনি ভারতের বহুভাষিক সমাজ, সংবাদমাধ্যমের ব্যাপকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার তুলে ধরেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার মোদীর বক্তব্যের সঙ্গে দিল্লির বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার বৈপরীত্য তুলে ধরে একে বিদ্রূপাত্মক বলে বর্ণনা করেছে।
গত ১০ অক্টোবর থেকে দিল্লিতে বিরোধীদের বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার, ব্যারিকেড, আটক এবং গণপরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধের খবর এসেছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিবাদের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে কর্তৃপক্ষ।
মোদী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে, সেটি আসল প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’ তাঁর এই বক্তব্যের পর ভারতের গণতান্ত্রিক চর্চা এবং বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ নিয়ে বিতর্ক আরও সামনে এসেছে।
বিতর্ক ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে
দিল্লির বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান বিষয় ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন—এসআইআর) প্রক্রিয়া। বিরোধী দল ও সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংশোধনে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়া নিয়ে দেশটিতে প্রতিবাদ হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, মৃত, একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত এবং ভোটার হওয়ার যোগ্য নন—এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তালিকা সংশোধন করা হচ্ছে।
বিরোধীদের আশঙ্কা, তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার কারণে প্রকৃত ভোটাররা ভোটাধিকার হারাতে পারেন। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রবীণ, অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ এতে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন বলে সমালোচকেরা দাবি করছেন। তবে তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রত্যেক ব্যক্তি যোগ্য ভোটার ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও আপত্তি যাচাই করা প্রয়োজন।
মোদী তাঁর বক্তব্যে ভারতের নাগরিকদের প্রকাশ্যে বিতর্ক ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগের কথা বলেন। তিনি জানান, দেশটিতে ১০০টির বেশি ভাষা, প্রায় ৮০ হাজার নিবন্ধিত সংবাদপত্র ও প্রকাশনা এবং এক হাজারের বেশি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। তাঁর দাবি, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রাম—দুই প্ল্যাটফর্মেই ভারতের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ কোটির বেশি।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, গণতন্ত্রের মূল্যায়ন শুধু সংবাদমাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা দিয়ে করা যায় না; বিরোধীদের প্রতিবাদ, নাগরিকের মতপ্রকাশ এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার কতটা সুরক্ষিত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রশংসা, ইউপিআইয়ে ফি নিয়ে বিতর্ক
মোদী ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থারও প্রশংসা করেন। তাঁর বক্তব্য, রাস্তার পাশের ছোট দোকান থেকে শুরু করে বড় গাড়ির শোরুম—বিভিন্ন আকারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান একই ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো ব্যবহার করছে।
এদিকে, ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি বাণিজ্যিক লেনদেনে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১৫ অক্টোবর থেকে এই ফি কার্যকরের কথা থাকলেও ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়া (এনপিসিআই) তা দীপাবলির পর পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় নির্দিষ্ট শর্তে ২ হাজার রুপির বেশি বাণিজ্যিক লেনদেনে ০.৪ শতাংশ ফি আরোপের কথা রয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলের একাংশের আশঙ্কা, নতুন ফি তাঁদের ব্যয় বাড়াতে পারে এবং তার প্রভাব পণ্যের দামেও পড়তে পারে। তবে ফি সরাসরি গ্রাহকের ওপর চাপানোর বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে; ফলে গ্রাহকদের ওপর এর প্রকৃত প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর।
ভারতকে ‘গণতন্ত্রের জননী’ হিসেবে তুলে ধরে মোদী আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সামনে দেশটির গণতান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেছেন। তবে ভোটার তালিকা সংশোধন, বিরোধীদের বিক্ষোভ এবং পুলিশের পদক্ষেপ ঘিরে চলমান বিতর্কে তাঁর সরকারের গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে প্রশ্নও অব্যাহত রয়েছে।