ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ২০২৬-২৭ মৌসুমের লিগ পর্বের ড্র অনুষ্ঠিত হয়েছে। মোনাকোতে বৃহস্পতিবারের ড্রয়ে ৩৬টি দল জেনে গেছে লিগ পর্বে তাদের আট প্রতিপক্ষের নাম। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) পেয়েছে বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার সিটি ও অ্যাস্টন ভিলার মতো কঠিন প্রতিপক্ষ। আর্সেনালের সামনে আবার রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের পরীক্ষা।
নতুন ফরম্যাটে প্রতিটি দল লিগ পর্বে আটটি ম্যাচ খেলবে— চারটি নিজেদের মাঠে এবং চারটি প্রতিপক্ষের মাঠে। চারটি আলাদা সিডিং পট থেকে প্রতিটি দল দুটি করে প্রতিপক্ষ পেয়েছে। একই দেশের দুটি দলকে লিগ পর্বে একে অপরের বিপক্ষে রাখা হয়নি।
শিরোপাধারী পিএসজির জন্য ড্রটি মোটেও সহজ হয়নি। নিজেদের মাঠে বার্সেলোনাকে আতিথ্য দেবে তারা। এর সঙ্গে অ্যাস্টন ভিলার মাঠে এবং ম্যানচেস্টার সিটির মাঠে গিয়ে খেলতে হবে ফরাসি ক্লাবটিকে। নিজেদের মাঠে পিএসজির অন্য প্রতিপক্ষ রোমা ও গালতাসারাই। অ্যাওয়ে ম্যাচে ভিয়ারিয়াল ও কোমোর পাশাপাশি খেলবে তারা।
বার্সেলোনারও কঠিন সূচি। স্প্যানিশ ক্লাবটি নিজেদের মাঠে ম্যানচেস্টার সিটি ও পিএসজির বিপক্ষে খেলবে। অ্যাস্টন ভিলা ও কোমোকেও ঘরের মাঠে আতিথ্য দেবে তারা। আর অ্যাওয়ে ম্যাচে স্পোর্টিং, গালতাসারাই ও আজারবাইজানের অভিষেককারী সাবাহর পাশাপাশি খেলবে।
গত মৌসুমের ফাইনালিস্ট আর্সেনালের লিগ পর্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হবে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে। রিয়ালকে ঘরের মাঠে আতিথ্য দেবে তারা। অন্যদিকে বায়ার্ন মিউনিখ ও রিয়াল বেতিসের মাঠে খেলবে আর্সেনাল। নিজেদের মাঠে ডর্টমুন্ড, লিল ও সাবাহর বিপক্ষে খেলবে তারা। স্লাভিয়া প্রাহার মাঠেও যেতে হবে ইংলিশ ক্লাবটিকে।
রেকর্ড ১৫ বারের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদও পেয়েছে বেশ কিছু কঠিন প্রতিপক্ষ। নিজেদের মাঠে ইন্টার মিলান, পিএসভি, আরবি লাইপজিগ ও এলএএসকের বিপক্ষে খেলবে তারা। আর অ্যাওয়ে ম্যাচে আর্সেনাল, রোমা, শাখতার দোনেৎস্ক ও এইকে এথেন্সের মাঠে যেতে হবে। এর মধ্যে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে ম্যাচটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কোচ হোসে মরিনহোর জন্য। ২০১০ সালে ইন্টারকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানো মরিনহো এবার রিয়ালের কোচ হয়ে সাবেক ক্লাবের মুখোমুখি হবেন।
লিভারপুলের সূচি তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বস্তিদায়ক। অ্যানফিল্ডে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, পোর্তো, ভিয়ারিয়াল ও লেন্সের বিপক্ষে খেলবে তারা। আর ইন্টার মিলান, ক্লাব ব্রুগ, ফেনারবাচে ও এলএএসকের মাঠে খেলবে। তবে অ্যাটলেটিকোর বিপক্ষে ম্যাচটি বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করবে। গত মৌসুমে অ্যানফিল্ডে স্প্যানিশ ক্লাবটিকে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল লিভারপুল।
বায়ার্ন মিউনিখও শুরুতেই কঠিন প্রতিপক্ষ পেয়েছে। জার্মান জায়ান্ট নিজেদের মাঠে আর্সেনাল, রিয়াল বেতিস, বোডো/গ্লিমট ও স্লাভিয়া প্রাহার বিপক্ষে খেলবে। অ্যাওয়ে ম্যাচে যেতে হবে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিল ও ভাইকিংয়ের মাঠে।
দুই বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগে ফিরেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। তাদের লিগ পর্বের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটি হবে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে। ১৯৯৯ সালের ঐতিহাসিক ফাইনালের স্মৃতি জাগানো এই ম্যাচটি হবে মিউনিখে। ইউনাইটেডের অন্য প্রতিপক্ষ অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, পিএসভি, স্পোর্টিং, রিয়াল বেতিস, শাখতার, এইকে এথেন্স, সাবাহ ও কোমো।
ম্যানচেস্টার সিটিও পেয়েছে পিএসজি ও বার্সেলোনার মতো দুই বড় প্রতিপক্ষ। পিএসজির মাঠে খেলতে যাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের মাঠে বার্সেলোনা, স্পোর্টিং, নাপোলি ও এইকে এথেন্সকে আতিথ্য দেবে সিটি। অ্যাওয়ে ম্যাচে পোর্তো, লাইপজিগ ও লেন্সের মাঠেও খেলবে তারা।
এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে চারটি দল প্রথমবারের মতো মূল লিগ পর্বে খেলবে—ইতালির কোমো, অস্ট্রিয়ার এলএএসকে, নরওয়ের ভাইকিং ও আজারবাইজানের সাবাহ। এর মধ্যে কোমোর জন্য অভিষেকেই অপেক্ষা করছে বড় পরীক্ষা। বার্সেলোনা ও রিয়াল বেতিসের মাঠে খেলবে তারা। নিজেদের মাঠে আবার পিএসজি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো দলের বিপক্ষে নামবে।
আজারবাইজানের সাবাহও পেয়েছে কঠিন সূচি। ঘরের মাঠে ডর্টমুন্ড, নাপোলি ও স্লাভিয়া প্রাহার বিপক্ষে খেলবে তারা। অ্যাওয়ে ম্যাচে যেতে হবে বার্সেলোনা, আর্সেনাল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাঠে।
নরওয়ের বোডো/গ্লিমটের মাঠে খেলতে হবে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, ডর্টমুন্ড, লিল ও এলএএসকের মতো চার দলকে। আর্কটিক সার্কেলের ভেতরে অবস্থিত বোডো শহরের কৃত্রিম টার্ফের মাঠে শীতের সময়ে ম্যাচ হওয়ায় এই সফরগুলোও আলাদা চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
লিগ পর্বের প্রথম ম্যাচডে হবে ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচডে ১৩ ও ১৪ অক্টোবর, তৃতীয় ২০ ও ২১ অক্টোবর, চতুর্থ ৩ ও ৪ নভেম্বর, পঞ্চম ২৪ ও ২৫ নভেম্বর এবং ষষ্ঠ ৮ ও ৯ ডিসেম্বর। নতুন বছরের জানুয়ারিতে সপ্তম ম্যাচডে ১৯ ও ২০ জানুয়ারি এবং শেষ বা অষ্টম ম্যাচডে হবে ২৭ জানুয়ারি।
লিগ পর্ব শেষে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ আট দল সরাসরি শেষ ষোলোতে জায়গা পাবে। নবম থেকে ২৪তম স্থানে থাকা দলগুলো খেলবে নকআউট প্লে-অফ। সেখান থেকে আটটি দল শেষ ষোলোর বাকি জায়গা পূরণ করবে। আর ২৫ থেকে ৩৬ নম্বরে থাকা দলগুলো ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নেবে।
নকআউট প্লে-অফ হবে ১৬, ১৭ ও ২৩, ২৪ ফেব্রুয়ারি। শেষ ষোলোর ম্যাচ ৯, ১০ ও ১৬, ১৭ মার্চ। কোয়ার্টার ফাইনাল ৬, ৭ ও ১৩, ১৪ এপ্রিল এবং সেমিফাইনাল ২৭, ২৮ এপ্রিল ও ৪, ৫ মে। মৌসুমের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ৫ জুন।
এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে মোট ৩৬টি দল প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ইউরো প্রাইজমানির জন্য লড়বে। তবে অর্থের চেয়েও বড় আকর্ষণ হবে লিগ পর্বেই একাধিক মহারণ—পিএসজি বনাম বার্সেলোনা, রিয়াল বনাম আর্সেনাল, বায়ার্ন বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং লিভারপুল বনাম ইন্টার মিলানের মতো ম্যাচ। নতুন ফরম্যাটের চ্যাম্পিয়নস লিগে তাই প্রথম ম্যাচ থেকেই জমে উঠতে পারে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় লড়াই।