নেপাল–তিব্বত সীমান্তের কাছে নদীর গতিপথ আটকে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। হ্রদটির পানি উপচে পড়ায় যেকোনো সময় এটি ভেঙে গিয়ে ভাটির দিকে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে চীন। এরই মধ্যে হ্রদটিতে আরও বিপুল পরিমাণ পানি জমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত হ্রদটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে প্রবেশ করতে পারে। ফলে হ্রদের পাড় ধসে পড়া বা পানি হঠাৎ প্রবাহিত হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
নেপালের ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে হ্রদটি তৈরি হয়েছে। নদী দুটি তিব্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে নেপালে প্রবেশের আগে মিলিত হয়েছে। নেপালে এই নদী ভোটেকোশি নামে পরিচিত, যা ত্রিশূলী নদীর অন্যতম প্রধান উজানের উপনদী।
নতুন এই হ্রদ তৈরি হয়েছে বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর। হিমবাহ ধসের পর লেন্দে নদীতে কাদা ও ধ্বংসস্তূপের প্রবল স্রোত নেমে এসে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিপর্যয় সৃষ্টি করে। ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী বহু গ্রাম, বাজার, সড়ক, সেতু ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নেপাল পুলিশের হিসাবে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত বন্যায় অন্তত ৩৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৯০০ মানুষ। তাঁদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতের নাগরিক। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকও রয়েছেন।
বন্যার ভয়াবহতা উঠে এসেছে ওপর থেকে ধারণ করা ভিডিওতে। একসময় জনবহুল গ্রাম ও বাজারের জায়গায় এখন কাদা ও ধ্বংসস্তূপ। কোনো কোনো এলাকায় ঘরবাড়ি পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রসের নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার জানিয়েছেন, কয়েকটি গ্রাম ও ব্যস্ত বাজার এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিব্বতের সীমান্তবর্তী জিরং শহরেও বন্যার প্রভাব পড়েছে। চীনা সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ নিখোঁজ। প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কাদার বিশাল স্রোত বহুতল ভবনের ওপর আছড়ে পড়ছে। গাড়ি ও বাসও স্রোতে ভেসে গেছে।
নেপালে উদ্ধার অভিযান চলছে। সেনাবাহিনী আকাশপথে দুর্গত এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নিচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হয়েছে। সম্ভাব্য নতুন বন্যার আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে যান চলাচলও সীমিত করা হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ নতুন তৈরি হওয়া হ্রদটির পানির স্তর ও গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। হ্রদটি ভেঙে গেলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে বন্যার কৃত্রিম মডেলও তৈরি করা হয়েছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ুঝুঁকি বিশেষজ্ঞ চিয়াংগং ঝাংও নতুন বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সীমান্তবর্তী নদীর উজানে ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপে পানি আটকে আছে। সেই বাধা হঠাৎ ভেঙে গেলে বিপুল পানি ভাটির দিকে নেমে নতুন বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নেপাল–তিব্বত সীমান্তের নদীগুলোর উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। একদিকে চলছে ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজদের উদ্ধারের চেষ্টা, অন্যদিকে নতুন করে পানি ছুটে আসার আশঙ্কা—দুই সংকটই এখন সামলাতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বন্যা ও ভূমিধস নতুন নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, বরফ ও পানি-সম্পর্কিত আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে একটি দুর্যোগের পরপরই আরেকটি বিপর্যয়ের আশঙ্কা এখন আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
হিমবাহ ধসের পর চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্দে নদীতে কাদা ও ধ্বংসস্তূপ তীব্র গতিতে ছুটলে এই বিপর্যয়ের শুরু হয়। বন্যার তীব্র স্রোত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে আঘাত হানে। এতে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে গেছে। উদ্ধার অভিযান চলার সময় ওপর থেকে ধারণ করা একটি ভিডিওতে বন্যার ভয়াবহতা উঠে এসেছে। একসময়ের প্রাণবন্ত গ্রামগুলোর ঘরবাড়ি এখন কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে। নেপালের সেনাবাহিনী উপদ্রুত এলাকা থেকে আকাশপথে লোকজনকে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। রেডক্রসের (আইএফআরসি) নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার জানান, এই বন্যায় কিছু গ্রাম ও ব্যস্ততম বাজার এলাকা পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত নেপাল পুলিশ ৩৮৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এখনো প্রায় ৯০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতের নাগরিক। নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের পর্যটক আছেন। অন্যদিকে তিব্বত সীমান্তের জিরং শহরে তিনজন মারা গেছেন এবং পাঁচ শতাধিক নিখোঁজ আছেন। চীনের সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।

তিব্বত অংশের একটি সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা) ফুটেজে দেখা গেছে, কাদার এক বিশাল ঢেউ একটি বহুতল ভবনের ওপর আছড়ে পড়ছে। কাদার তোড়ে গাড়ি ও বাসগুলো খেলনার মতো ভেসে যাচ্ছে। বন্যার পানি বহুতল ভবনের নিচতলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দিয়েছে। উদ্ধারকারীরা বুকসমান কাদা ভেঙে বেঁচে যাওয়া মানুষদের খুঁজছেন। এই বন্যার প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায়ও। উত্তর প্রদেশ ও বিহারের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বন্যা–সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মৌসুমি বৃষ্টিতে নিয়মিত বন্যা ও ভূমিধস হয়। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে ঘন ঘন এবং তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটছে।
এদিকে ওই এলাকায় নতুন করে আরেকটি বন্যার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) জলবায়ুঝুঁকি বিশেষজ্ঞ চিয়াংগং ঝাং এ সতর্কতা দিয়েছেন। তিনি জানান, চীন-নেপাল সীমান্তবর্তী নদীর উজানে ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপ আটকে আছে। এ কারণে সেখানে আরেকটি বন্যা দেখা দিতে পারে। আটকে থাকা পানি হঠাৎ ধেয়ে এলে ভাটি অঞ্চলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।