র্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়ি। সাদাপোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁদের কাছে পরিচয়পত্র বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চেয়েছিলেন মেসে থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) এক প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থী। কিন্তু তা দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। একপর্যায়ে তাঁকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীরা বাধা দিলে তাঁকে রেখে চলে যান ওই ব্যক্তিরা। রোববার ভোরে রাজধানীর পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকার একটি মেসে এ ঘটনা ঘটে। পরে সূত্রাপুর থানার পুলিশ জানায়, ওই ব্যক্তিরা র্যাব-২-এর সদস্য। একটি মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে ওই নারীকে নিতে তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন। তবে তাঁকে কেন আটক বা গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল, সেই মামলার বিস্তারিত তথ্য পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি। ঘটনার শিকার মমতাজ আরা বর্ষা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর দুই সহপাঠীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তিনি স্নাতকোত্তর শেষ করেন।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে সংবাদ সম্মেলন করেন মমতাজ আরা। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে তাঁর ছোট বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র্যাবের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মমতাজের দাবি, চলতি বছরের মে মাসে তাঁর ছোট বোনের সঙ্গে সুমন মিয়ার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে সুমন তাঁদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছেন। গত আগস্টে দিনাজপুর জজকোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সুমনের বিরুদ্ধে মামলা করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। এরপর ফোন ও মুঠোফোনের বার্তায় তাঁদের হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি। মমতাজ বলেন, ‘সুমন মিয়া র্যাবের আইটি সেকশনে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। সে র্যাবের সেই পরিচয় ব্যবহার করে আমাকে অপহরণের চেষ্টা করেছে।’
ভোরের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সাদাপোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের ফ্ল্যাটের দরজায় এসে র্যাবের পরিচয় দেন। অপরিচিত হওয়ায় প্রথমে তাঁরা দরজা খুলতে চাননি। পরে দরজা খুললে ওই ব্যক্তিরা তাঁকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু কোনো পরিচয়পত্র, মামলা বা পরোয়ানা দেখাননি বলে তাঁর দাবি।

মমতাজ বলেন, ‘আমরা বারবার ওয়ারেন্ট দেখাতে বললেও তারা ওয়ারেন্ট ছাড়াই আমাকে তুলে নিতে চায়। আমার বাসাও সার্চ করে। কিন্তু সেখানে কোনো নারী র্যাব সদস্য ছিল না।’ একপর্যায়ে তাঁকে র্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে তোলা হয় বলে জানান তিনি। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, ওই নারীকে গাড়িতে তোলা হয়েছে। তাঁরা স্পষ্ট করে জানান, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তারেক বিন আতিক বলেন, ‘প্রথমে ওই ব্যক্তিরা ভুল করে সেখানে এসেছেন বলে জানান। পরে জানান, তাঁরা চুরির মামলার আসামি ধরতে এসেছেন। এর মধ্যেই ছাত্রীকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।’ তাঁর ভাষ্য, ওই ব্যক্তিদের কাছে পরিচয়পত্র ও মুঠোফোন নম্বর চাওয়া হলেও তাঁরা তা দিতে রাজি হননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, ‘ঘটনার খবর পাওয়ার পর আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, একজন শিক্ষার্থীকে র্যাবের গাড়িতে তোলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটি আইন অনুযায়ী তদন্ত হবে। একই সঙ্গে তাঁকে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
ঘটনার সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ করা হয়। জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সকালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান এবং বিষয়টি সূত্রাপুর থানার ওসিকে জানান। পরে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হন। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, র্যাবের পরিচয়ে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে প্রথমে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। পরে পোশাকধারী র্যাব সদস্যরা সেখানে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত ওই নারীকে নিরাপদে রাখা হয়।
তবে সূত্রাপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আনোয়ার বলেন, মেসে যাওয়া ব্যক্তিরা র্যাবের সদস্য ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে যারা এসেছিল, তারা র্যাবের সদস্য ছিল এবং একটি মামলার অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিল। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, এটি পারিবারিক বিরোধের কারণে করা একটি মামলা। পরে ওই শিক্ষার্থীকে না নিয়ে তারা চলে যায়।’ ওসি জানান, সংশ্লিষ্ট মামলাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যোগাযোগ করে তথ্য নেওয়া প্রয়োজন।
ঘটনাটি নিয়ে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে—কোন মামলার ভিত্তিতে মমতাজ আরা বর্ষাকে নিতে র্যাবের সদস্যরা মেসে গিয়েছিলেন, তাঁকে নেওয়ার আইনগত প্রক্রিয়া কী ছিল এবং ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিরা কেন পরিচয়পত্র বা প্রয়োজনীয় নথি দেখাননি। এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
এদিকে মমতাজ আরা তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁকে ভয় দেখানো ও তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।