মাদারীপুর সদর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুকুরের প্রায় ৪০ শতাংশ মাটি ও বালু দিয়ে ভরাট করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফায়েকুজ্জামান বাবুলের উদ্যোগে পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশের অভিযোগও করেছেন তাঁরা। উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের ৪৬ নম্বর চরনাচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটেছে।

তবে ইউপি চেয়ারম্যান ফায়েকুজ্জামান বাবুলের দাবি, শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ সম্প্রসারণের জন্য সরকারি প্রকল্পের আশায় পুকুরটি ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় পরে তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ করে পুকুরটি ভরাট করেছেন। চেয়ারম্যান বলেন, ‘জনস্বার্থে ও শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা ভেবে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে স্কুলের পুকুরটি ভরাট করেছি। এতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।’ তবে সরকারি বিদ্যালয়ের পুকুর ভরাটের ক্ষেত্রে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে চেয়ারম্যান কোনো অনুমতিপত্রের কথা জানাননি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুমন মিয়া বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান পুকুরটি ভরাট করেছেন। খেলার মাঠ বড় করার জন্য এটি করতে দেওয়া হয়েছে। তবে আমার কাছে পুকুর ভরাটের কোনো সরকারি অনুমতিপত্র নেই।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পুকুরটি বিদ্যালয়ের সম্পত্তির অংশ এবং এটি ভরাটের ফলে শুধু জলাধারই নষ্ট হচ্ছে না, বরং এলাকার পানি নিষ্কাশন ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পরিবেশকর্মীরাও পুকুর ভরাটের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন। পরিবেশভিত্তিক সংগঠন ‘ফ্রেন্ডস অব নেচার’-এর নির্বাহী পরিচালক রাজন মাহমুদ বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পুকুর ভরাট করা গুরুতর আইনি অপরাধ। ভরাট করা মাটি অপসারণ করে পুকুরটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।’
মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘আইন অমান্য করে ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে সরকারি পুকুর ভরাটের পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
‘প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’ অনুযায়ী, কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী বা খালের স্বাভাবিক চরিত্র পরিবর্তন বা তা ভরাট করা নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ছাড়া আদালতের বিভিন্ন রায়েও জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন ও ভরাটের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে এবং জেলা প্রশাসক মহোদয়ও বিষয়টি অবগত আছেন। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
মাদারীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফজলে এলাহী বলেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের মাদারীপুরের উপপরিচালক জেসমিন আক্তার বানু বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যানের কোনো আইনি অধিকার নেই বিদ্যালয়ের সম্পত্তি বা পুকুর ভরাট করার।’ অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুকুর ভরাটের কাজ শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি দপ্তরের অনুমতি নেওয়া হয়নি। চেয়ারম্যান নিজ অর্থে কাজটি করার কথা বললেও সরকারি বিদ্যালয়ের সম্পত্তিতে এ ধরনের পরিবর্তন করার আইনগত এখতিয়ার তাঁর আছে কি না, সেটিও এখন তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে প্রশাসন তদন্তের কথা বললেও পুকুরটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।