দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকার পর জাতীয় সংসদে ফিরেছেন ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাস। ২০০৬ সালের পর দীর্ঘ বিরতি শেষে বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে হুইলচেয়ারে বসে দেওয়া বক্তব্যের একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মির্জা আব্বাস। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, অশ্রু সংবরণের চেষ্টা করতে দেখা যায় তাঁকে।
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন মির্জা আব্বাস। বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘দেশ ও জাতির সেবায় জীবনের বাকি সময়টুকু যেন উৎসর্গ করতে পারি—এ জন্য দলমত-নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের কাছে দোয়া চাই।’
সংসদে ফিরে আসার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ২০০৬ সালের পর আবার জাতীয় সংসদের এই কক্ষে একজন সংসদ সদস্য হিসেবে কথা বলার সুযোগ পাওয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আবেগপূর্ণ ও স্মরণীয় মুহূর্ত। এত দীর্ঘ বিরতির পর মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আবার সংসদে দাঁড়াতে পারা তাঁর জন্য আনন্দ ও গর্বের বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতে মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন মির্জা আব্বাস। একই সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
নিজের অসুস্থতার সময়ের কথা তুলে ধরে মির্জা আব্বাস বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পরপরই একটি দলীয় রাজনৈতিক সভায় অংশ নেওয়ার সময় তিনি গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যেতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পরও তিনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি।
তবে শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে সংসদে আসা থেকে বিরত রাখতে পারেনি বলে জানান বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, আবেগ এবং তাঁদের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ না হয়েও সংসদে উপস্থিত হয়েছেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে নিজের চিকিৎসার সময় পাওয়া সহায়তা ও সহমর্মিতার কথা উল্লেখ করেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, তাঁর অসুস্থতার খবর পেয়ে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও তাঁর শারীরিক অবস্থার নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেপুটি স্পিকারের এই মানবিক আচরণ তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে বলে জানান তিনি। মির্জা আব্বাস বলেন, এটি শুধু একজন অসুস্থ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা নয়; সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি মানবিক ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই আন্তরিকতা ও ভালোবাসা তিনি কোনোদিন ভুলবেন না।
সংসদীয় রাজনীতির উদ্দেশ্য নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন মির্জা আব্বাস। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি শুধু দলীয় পার্থক্য কিংবা রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয় নয়; রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য মানুষের সেবা করা।’
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ শুধু বিতর্কের মঞ্চ নয়। এটি দেশের মানুষের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব মানুষের কথা বলা এবং তাঁদের কল্যাণে কাজ করা।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মির্জা আব্বাস বলেন, সংসদে ফিরে আসা তাঁর কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়; এটি মানুষের কাছে ফিরে আসারও একটি সুযোগ। অসুস্থতার কঠিন সময় পেরিয়ে তিনি আবার জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন—এ জন্য তিনি মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নিজের দ্রুত ও পূর্ণ সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, সুস্থ হয়ে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষের পাশাপাশি পুরো দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চান। জীবনের বাকি সময় নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে দেশ ও জাতির সেবায় ব্যয় করার প্রত্যয়ও জানান তিনি।
অসুস্থতার সময়ে পাশে থাকা এবং তাঁর জন্য দোয়া ও প্রার্থনা করার জন্য সহকর্মী সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দেশবাসীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান মির্জা আব্বাস।
দীর্ঘ বিরতির পর সংসদে ফিরে নিজের বক্তব্যের শেষভাগে তিনি আবারও মানুষের সেবার অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন। বলেন, ২০০৬ সালের পর তিনি আবার মানুষের কাছে, মানুষের সেবায় এবং প্রিয় বাংলাদেশের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করতে ফিরে এসেছেন।
শারীরিকভাবে এখনো পুরোপুরি সুস্থ না হলেও হুইলচেয়ারে বসে দেওয়া তাঁর এই বক্তব্যের সময় সংসদে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর সংসদে ফিরে মির্জা আব্বাসের বক্তব্যে যেমন ছিল নিজের জীবনের কঠিন সময়ের স্মৃতি, তেমনি ছিল ভবিষ্যতে মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয়।