জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়া সাবেক বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমান হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি পদ থেকে ঘুষের অভিযোগের ঘটনায় অপসারিত হয়েছিলেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে সে সময়ের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালে আপিল বিভাগ তাঁর অপসারণের সিদ্ধান্তকে বৈধ বলে রায় দেন।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রায় ২২ বছর আগের ওই ঘটনায় শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি; সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁকে অপসারণ করা হয়েছিল। দলটির দাবি, ওই ঘটনার আগে বা পরে তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনো অভিযোগ নেই। তবে শাহিদুর রহমান জামায়াতে সহযোগী সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন এবং ধাপে ধাপে সততার প্রমাণ দিয়ে তাঁকে কর্মী ও পরে রুকন (সদস্য) হতে হবে।
২০০৩ সালের এপ্রিলে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে শাহিদুর রহমানকে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর কয়েক মাস পর তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে জামিন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন ও মামলার নথি অনুযায়ী, নাসিম সুলতানা কনা নামের এক নারী আইনজীবী বিষয়টি সে সময়ের সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদের নজরে আনেন।
কনার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৩ সালের ২০ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান রাষ্ট্রপতিকে বিষয়টি অবহিত করেন। পরে প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান, আপিল বিভাগের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি রুহুল আমিন এবং বিচারপতি মো. ফজলুল করিমকে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হয়। কাউন্সিল অভিযোগটি তদন্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি’। তবে একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, পাওয়া তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগটির কোনো ভিত্তি নেই—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাচ্ছে না। এই অবস্থায় তাঁকে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া উচিত নয় বলে মত দেয় কাউন্সিল।
এর ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি শাহিদুর রহমানকে অতিরিক্ত বিচারপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। রাষ্ট্রপতির ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন শাহিদুর রহমান।
২০০৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে তাঁকে বিচারক পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে একই বছরের এপ্রিলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে রাষ্ট্রপতির অপসারণের সিদ্ধান্তকে বৈধ ঘোষণা করেন।
এর প্রায় ১১ বছর পর, গত মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন সৈয়দ শাহিদুর রহমান। দলটির একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, জামায়াতে আসার আগে তিনি দলটি সম্পর্কে পড়াশোনা করেছেন এবং এরপর রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে বিচারক পদ থেকে অপসারণের পেছনে ঘুষের অভিযোগ এবং এ নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের বিষয়ে অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের তদন্তে শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সন্দেহের কারণে তাঁকে অপসারণ করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আরও বলেন, শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওই ঘটনার আগে বা পরে আর কোনো অভিযোগ নেই। তিনি এখন জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। অন্য দলের মতো জামায়াতে যোগ দিয়েই কেউ নেতা হয়ে যান না। সততা ও আদর্শের প্রমাণের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে সাংগঠনিক দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালে আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপতির অপসারণের সিদ্ধান্তকে বৈধ ঘোষণা করেছিল। ফলে শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল কি না এবং তাঁকে বিচারকের দায়িত্বে রাখা সমীচীন ছিল কি না—এই দুই প্রশ্নকে আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রতিবেদনে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ার কথা বলা হলেও একই প্রতিবেদনে অভিযোগটির ভিত্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি; আর পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ আদালত তাঁর অপসারণের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।