ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মুখে টেপ লাগানো অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির পরিচয় মিলেছে। তাঁর নাম ইসমাইল হোসেন (৫০)। জামালপুর থেকে মেয়ের বিয়ের জন্য জমি বিক্রির টাকা নিয়ে গাজীপুরে পরিবারের কাছে ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নিখোঁজ হন। পরদিন সকালে এক্সপ্রেসওয়ের ওপর তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।
ইসমাইলের পরিবারের দাবি, তাঁর সঙ্গে নগদ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ও দুটি মুঠোফোন ছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর সেগুলোর কোনোটি পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে, ইসমাইলকে শ্বাসরোধে হত্যার পর কোনো একটি গাড়ি থেকে এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন কয়েকটি গাড়ি শনাক্ত করা হয়েছে। শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ইসমাইলের মরদেহ শনাক্ত করেন তাঁর স্বজনেরা। তিনি জামালপুর সদর উপজেলার জালাল উদ্দিনের ছেলে। গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় স্ত্রী, দুই সন্তান ও ছেলের বউকে নিয়ে বসবাস করতেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ইসমাইলের একমাত্র মেয়ে শারমিনের বিয়ের কথা চলছিল। বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করতেই তিনি গ্রামের বাড়ি থেকে গাজীপুরে ফিরছিলেন। এ জন্য গ্রামের ১১ শতাংশ জমি সাড়ে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। এর মধ্যে আগের ঋণের দুই লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিছু টাকা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে একটি ঘর নির্মাণ করেন। বাকি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নগদ নিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হন।
ইসমাইলের ছেলে হাসান বলেন, তাঁর বাবার কাছে নগদ পাঁচ লাখ টাকা ছিল। সঙ্গে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও একটি বাটন ফোনও ছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর এসব কিছুই পাওয়া যায়নি। হাসান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে গাজীপুরের উদ্দেশে জামালপুর থেকে রওনা হয়েছিলেন বাবা। রাত ১১টার দিকে তিনি আমাকে ফোন করে জানান, সকালে এসে পৌঁছাবেন। ছোট বোন শারমিনের বিয়ের কথা চূড়ান্ত করতেই তিনি ঢাকায় আসছিলেন। এসে বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করার কথা ছিল।’ কিন্তু এরপর পরিবারের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি ইসমাইলের।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে তাঁর গাজীপুরের জিরানী এলাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। ছেলে রাসেল সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করেন। বাবার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও সেটি বন্ধ পান। পরে ইসমাইলের সন্ধানে পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই বনানী থানা পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধারের খবর জামালপুরে স্বজনদের জানায়। পরে পরিবারের সদস্যরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন। শুক্রবার সকালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে ইসমাইলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন তাঁর মুখে টেপ লাগানো ছিল। পরনে ছিল অটোরিকশাচালকদের পোশাকের মতো নীল রঙের শার্ট ও লুঙ্গি।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন কয়েকটি গাড়ি শনাক্ত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইসমাইলকে শ্বাসরোধে হত্যার পর ওই গাড়িগুলোর কোনো একটি থেকে এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে দেওয়া হয়েছে। গাড়িগুলো আটক করা গেলে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে ইসমাইলের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। বনানী থানার এসআই নজরুল ইসলাম তালুকদার এ তথ্য জানান। তবে ইসমাইলকে কোথায়, কীভাবে এবং কারা হত্যা করেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে থাকা পাঁচ লাখ টাকা ও মুঠোফোনের সন্ধানও মেলেনি। ফলে হত্যার পেছনে অর্থ লুটের উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইসমাইল আগে গাজীপুরের ডেল্টা স্পিনিং মিলে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। অসুস্থতার কারণে প্রায় নয় মাস আগে চাকরি ছেড়ে দেন। এরপরও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কাশিমপুরে বসবাস করছিলেন। প্রায় চার মাস আগে তিনি জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখানে তাঁর মা ও বড় বোন থাকেন।
মেয়ের বিয়ের আয়োজনের জন্য জমি বিক্রি করে পাওয়া টাকা নিয়ে আবার গাজীপুরে ফিরছিলেন তিনি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগেই তাঁর মৃত্যু হলো। এখন মেয়ের বিয়ের প্রস্তুতির বদলে পরিবারের সামনে এসেছে স্বজন হারানোর শোক এবং হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের অপেক্ষা।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পাশাপাশি এক্সপ্রেসওয়ের সিসিটিভি ফুটেজ, সন্দেহভাজন গাড়িগুলোর গতিবিধি এবং ইসমাইলের সর্বশেষ অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।