ঢাকার সাভারে সাত বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রকে ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে দুই শিক্ষকসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে মাদ্রাসার তিন শিক্ষার্থীও রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
শনিবার দুপুরে সাভার মডেল থানায় সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তবে মামলার তদন্ত এখনো চলছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১২, ১৩ ও ১৫ বছর বয়সী তিন কিশোর ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। অপর দুজন মাদ্রাসার শিক্ষক জাবের হোসেন (২১) ও কামরুল ইসলাম (২৬)। তাঁদের মধ্যে তিন কিশোর ও শিক্ষক জাবের হোসেনের বিরুদ্ধে শিশুটিকে ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়েছে। আর শিশুটি যাতে বিষয়টি পরিবারের কাছে জানাতে না পারে, সে জন্য তাকে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে শিক্ষক কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
পুলিশ কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান বলেন, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সাভার মডেল থানা, আশুলিয়া থানা ও ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক দল দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। বরগুনা, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকায় এসব অভিযান চালানো হয়। মামলাটি ঢাকা জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। আমরা আত্মবিশ্বাসী, খুব শিগগির বাকি আসামিদেরও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব।’
মামলার নথি অনুযায়ী, ছয় মাস ধরে শিশুটিকে বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে গত ২৩ আগস্ট তার বাবা ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করার আবেদন করেন। আদালতের বিচারক মাসরুর সালেকীন আবেদনটি আমলে নিয়ে সাভার মডেল থানাকে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
মামলার আবেদনে সাভারের পূর্ব শাহবাগ এলাকার ওই মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষার্থী, চার শিক্ষক ও পরিচালককে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। অপর তিন শিক্ষক ও পরিচালকের বিরুদ্ধে ঘটনা জানার পর ব্যবস্থা না নিয়ে শিশুটিকে মারধর ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, মামলার তদন্তের স্বার্থে এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের বিষয়েও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
দিনাজপুরে তিন শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদ্রাসাশিক্ষক কারাগারে
দিনাজপুরের বিরামপুরে তিন শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে এক মাদ্রাসাশিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রামবাসী তাঁকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার পর এক শিশুর বাবার করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার শিক্ষক হাসান আলী (২৫) দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। তিনি প্রায় এক বছর ধরে বিরামপুর উপজেলার ওই হাফেজিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছিলেন।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার ভোরে ওই মাদ্রাসায় ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় লোকজন শিক্ষক হাসান আলীকে আটক করেন। পরে তাঁকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গ্রেপ্তারের পর শুক্রবার বিকেলে তাঁকে দিনাজপুরের আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয়নুল আবেদীনের আদালতে তিনি তিন শিশুকে ধর্ষণের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিরামপুর থানার উপপরিদর্শক সোহেল রানা বলেন, তিন শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ওই শিক্ষক। তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলাটির তদন্ত চলছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদের একটি ভিডিওতেও ওই শিক্ষককে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের কথা বলতে দেখা গেছে বলে জানা গেছে। তবে তাঁর এসব বক্তব্যের সত্যতা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির এক সদস্য জানান, প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন শিক্ষক দিয়েই মাদ্রাসাটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি ও পরিচালনা কমিটির সদস্যদের আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলত। আগের শিক্ষক চাকরি ছেড়ে যাওয়ার পর হাসান আলীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই কমিটি সদস্য বলেন, শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থী যৌন নির্যাতনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সাভার ও দিনাজপুরের দুই ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আবাসিক বা অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া, নজরদারি এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এসব ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।